দায় চাপানো ও বিভাজনের বাক্যবাণ

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ এএম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কিংবা সংকট দেখা দিলে তার পরপরই বিরোধীপক্ষকে দায়ী করা রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে গেছে। সরকার রাজনৈতিক পরিচয় বদলালেও সংকটের মুহূর্তে প্রতিপক্ষের দিকে আঙুল তোলার অভ্যাস কখনো বদলায়নি। অরাজকতা, সহিংসতা, অব্যবস্থাপনা বা কোনো আলোচিত অপরাধ ঘটলে তদন্তের ফল আসার আগেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত ছুড়ে দেওয়া হয়।

তা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছিলেন, ধর্মঘট সমর্থকরা ভবনের দুর্বল পিলারে আঘাত করেছিল এবং সেটি ধসের কারণ হতে পারে। পরে তিনি নিজেই বলেছিলেন বিষয়টি নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক বহু উত্থান-পতন পেরিয়ে ১৩ বছর পরও সাম্প্রতিক রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির পেছনে জামায়াত বা আওয়ামী লীগের ইন্ধন ছিল কি না নিরপেক্ষ তদন্তেখতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিচয়কে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে সামনে আনার এই অপপ্রবণতা আমাদের রাজনৈতিক ভাষার পুরনো অসুখকে আবার সামনে এনেছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই পরিস্থিতিকে দায় এড়ানোর রাজনীতি বা ব্লেম গেম হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। স্টেন হ্যানসনের গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পক্ষগুলো সংকটের দায় নিজেদের কাছ থেকে সরিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর চাপাতে বিভিন্ন ভাষাগত কৌশল ব্যবহার করে। সংকটকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, কোন শব্দ বেছে নেওয়া হচ্ছে এবং কোন পক্ষকে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, এসবের মাধ্যমে জনমতকে একটি নির্দিষ্ট দিকে নেওয়ার চেষ্টা তৈরি হয়।

আরেকটি আলোচনা হচ্ছে, লেবেলিং বা তকমা দেওয়ার রাজনীতি। কোনো ব্যক্তিকে বা গোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট একটি নেতিবাচক পরিচয়ের মধ্যে আটকে দেওয়া হলে তার বক্তব্য, উদ্দেশ্য এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলাদা করে বিচার করার প্রয়োজন কমে যায়। ‘রাজাকার’, ‘জঙ্গি’, ‘গুপ্ত’ এ ধরনের শব্দ রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যবহৃত হলে একটি জটিল বাস্তবতাকে একটি শব্দের মধ্যে বন্দি করা সম্ভব হয়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সময় ‘রাজাকার’ শব্দের ব্যবহার কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়কে সংঘাতের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিল, তা নিয়ে গবেষণাতেও আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘গুপ্ত’ শব্দ নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, অতীতে তাদের ‘রাজাকার’ বা ‘যুদ্ধাপরাধী’ বলা হয়েছে, এখন ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে।

কেউ যখন বারবার একই নেতিবাচক শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পরিচয়কে ব্যাখ্যা করেন তখন পলিটিক্যাল রেটোরিক আকারে এটি জনমনে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে। এসব বাক্যবাণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক এই মেরুকরণ, এ ধরনের পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন প্রতিপক্ষের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বাড়াতে পারে এবং রাজনৈতিক বিরোধকে সামাজিক বিরোধে রূপ দিতে পারে। বাংলাদেশের শাহবাগ ও হেফাজত আন্দোলন নিয়ে গবেষণাতেও পরিচয় ও মতাদর্শের ফ্রেমিং কীভাবে দুটি পরস্পরবিরোধী শিবিরকে শক্তিশালী করেছিল, তা দেখানো হয়েছে।

রাজনৈতিক ভাষার এই পরিবর্তনের একটি বড় ক্ষতি হয় জবাবদিহিতে। কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ খুঁজতে হলে দরকার প্রমাণ, তদন্ত, প্রশাসনিক দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার বিশ্লেষণ। সেখানে রাজনৈতিক তকমা দ্রুত একটি প্রস্তুত ব্যাখ্যা দিয়ে দেয়। ফলে মূল ঘটনা যাই ঘটুক, যেই অপরাধী হোক তা ছাপিয়ে ঘটনাটিকে নিছকই রাজনীতিকীকরণ করা হয়। এভাবেই রাড্ডার ঘটনায় হামলার ক্ষেত্রে জমি বিরোধ, স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্ক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ত তা তদন্তের আগে দলীয় পরিচয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় ফ্রেমিং একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। একই ঘটনা কোন শব্দে বর্ণনা করা হচ্ছে, কার বক্তব্যকে সামনে আনা হচ্ছে এবং কাকে দায়ী হিসেবে হাজির করা হচ্ছে, তার ওপর মানুষের ঘটনাটি বোঝার ধরন অনেক সময় পরিবর্তন হয়। জুলাই বিপ্লব নিয়ে ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ১,১৫০টি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আন্দোলনের কারণ, অংশগ্রহণকারী ও দায় নির্ধারণে ভিন্ন ভিন্ন ফ্রেম ব্যবহার করেছে। আরেকটি গবেষণায় পাঁচটি বড় সংবাদপত্রের ২০২৪ সালের আন্দোলন নিয়ে প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একটি পত্রিকায় ৫৯ শতাংশ প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের অস্থিরতার জন্য দায়ী করা হয়েছিল, অন্যদিকে আরেকটি পত্রিকায় ৫৬ শতাংশ প্রতিবেদনে সরকার, পুলিশ বা সামরিক বাহিনীর দিকে দায় নির্দেশ করা হয় । অর্থাৎ একই রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন ভাষায় উপস্থাপিত হলে নাগরিকের কাছে তৈরি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার ধারণা। রাজনীতির মাঠে তকমা দেওয়ার শক্তি হচ্ছে একটি শব্দ কখনো কখনো একটি দীর্ঘ তদন্তের জায়গা দখল করে নেয়। মোটা হয় বিভাজনের রেখা। যেকোনো ঘটনা ‘কে করেছে’ প্রশ্নটি প্রমাণের ভিত্তিতে সমাধান হওয়ার আগেই ‘কারা করেছে’ নিয়ে রাজনৈতিক গল্প তৈরি হয়ে যায়। এভাবে দায় চাপানোর রাজনীতি গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কারণ অপরাধের তদন্তে প্রয়োজন সন্দেহ, প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং বিচারিক পরীক্ষা। রাজনৈতিক বক্তৃতায় প্রয়োজন হয় দ্রুত একটি শত্রু চিহ্নিত করার। দুই প্রক্রিয়া এক হয়ে গেলে সত্য অনুসন্ধানের জায়গা সংকুচিত হয় এবং প্রতিপক্ষকে অভিযুক্ত করার ভাষাই ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। রাজনীতির ভাষা যখন প্রতিদিনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যা হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পরিচয়ের চশমায় দেখা শুরু হয়। রাজনীতি যেন রূপ নিয়েছে দায় সরানোর প্রতিযোগিতায়। গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক ভাষা, যেখানে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য তকমা নয়, প্রমাণ হাজির করতে হয়। অপরাধের বিচার আদালত করবে, রাজনৈতিক মঞ্চ নয়।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী ও কলাম লেখক

sajjadsabbir 24 @gmail. com

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত