ফ্রান্সে আরও তীব্র হচ্ছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন আরও জোরালো হচ্ছে। শিক্ষা খাতে জরুরি ভিত্তিতে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের দাবিতে আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত আন্তঃইউনিয়ন জোট।

আন্দোলনের মুখে সরকার প্রায় তিন হাজার বিকল্প শিক্ষককে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, সাময়িক পদক্ষেপে সংকটের সমাধান হবে না। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে প্রয়োজন স্থায়ী সংস্কার ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদ, টিএফ১, টিভি৫ মোঁদ, ইউরোনিউজ ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা ও পাঠদানসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে অসন্তোষের সূত্রপাত হয়। পরে তা ক্রমে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে রূপ নেয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনও এতে যুক্ত হয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর প্যারিসের বাস্তিল চত্বরে হাজারো শিক্ষার্থী সমবেত হয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ সময় শিক্ষার্থী সংগঠন ইউনিয়ন এতুদিয়ঁতের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, শিক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। তিনি ১৩ অক্টোবরের কর্মসূচিতে আরও বেশি মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর চাপ কমানো, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রচলিত পারকুরসুপ (Parcoursup) ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলুপ্তি। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও শিক্ষকস্বল্পতার কারণে শিক্ষার মান কমছে এবং শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আন্দোলনের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে প্রায় তিন হাজার যোগ্য বিকল্প শিক্ষককে জরুরি ভিত্তিতে কাজে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট বেশি, সেখানে তাঁদের পাঠানো হবে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত এলাকার বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের একটি অংশ সরকারি উদ্যোগকে প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে দেখলেও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো কর্মসূচি প্রত্যাহার করেনি। তাদের মতে, শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করে অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে শিক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের দাবিতে সরকার এখনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে সরকারের উদ্যোগ আন্দোলনকারীদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

গত ৮ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আন্দোলনকারীদের মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই দিন দেশজুড়ে ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পৃথক কর্মসূচিতে আরও প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এর আগে ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আরও বেশি ছিল। সরকারি হিসাবে, সেদিন দেশজুড়ে ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। দুই দিনের পরিসংখ্যানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যায় ওঠানামা দেখা গেলেও নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখতে চায় শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো।

৮ অক্টোবরের বিক্ষোভে প্যারিসসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। লে মোঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের আগের দিনগুলোতে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং আহত কিশোর শিক্ষার্থীদের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জামের কারণে গুরুতর আহত হওয়ার অভিযোগ আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনার কয়েকটির তদন্তও শুরু হয়েছে।

আন্দোলনের পেছনে তাৎক্ষণিক অসন্তোষের পাশাপাশি সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাও কাজ করছে। রয়টার্সের ৯ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট পাঠদানের প্রায় ১০ শতাংশ সময় শিক্ষক পাওয়া যায়নি। অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিকল্প শিক্ষক দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে না পারা এর অন্যতম কারণ।

একই প্রতিবেদনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি বিদ্যালয়ে পাঠদানের অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে কিছু পরিবার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের তুলনায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।

ফলে আন্দোলনটি এখন শুধু শিক্ষক নিয়োগ ও বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার সুযোগে সমতা, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।

আন্তঃইউনিয়ন জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও ধর্মঘটের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। এ কর্মসূচিতে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যালয়ের পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট পরিষেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে কোন কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ থাকবে, তা স্থানীয় পরিস্থিতি ও কর্মীদের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে।

ফ্রান্সের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির জবাব দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কাটানো, অন্যদিকে বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা। সরকারের জরুরি পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয় এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় কি না, তার ওপর নির্ভর করছে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ।

১৩ অক্টোবরের কর্মসূচি তাই শুধু আরেকটি বিক্ষোভের দিন নয়; ফ্রান্সের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার এবং তরুণ প্রজন্মের দাবির প্রতি সরকারের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা যাচাইয়েরও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।