ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তীব্র

ফ্রান্সে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, শিক্ষক স্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে চলমান ছাত্র আন্দোলন নতুনমাত্রা পেয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠন, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত আন্তঃইউনিয়ন জোট আগামী মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। আন্দোলনকারীরা শিক্ষা খাতে জরুরিভিত্তিতে ১০ বিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে আন্দোলনের চাপের মুখে সরকার প্রায় তিন হাজার বিকল্প শিক্ষককে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি, বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদ, টিএফ১, টিভি৫ মোঁদ, ইউরোনিউজ ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক স্বল্পতা ও পাঠদানসংক্রান্ত সমস্যা কেন্দ্র করে যে অসন্তোষ শুরু হয়েছিল, তা ক্রমেই জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এখন এ আন্দোলনে উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনও যুক্ত হচ্ছে।

১০ বিলিয়ন ইউরোর দাবিতে আন্দোলন : গত বৃহস্পতিবার প্যারিসের বাস্তিল চত্বরে হাজারো শিক্ষার্থী সমবেত হয়ে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ সময় শিক্ষার্থী সংগঠন ইউনিয়ন এতুদিয়ঁতের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, শিক্ষা খাতে ১০ বিলিয়ন ইউরোর অর্থায়নের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। তিনি আগামী ১৩ অক্টোবরের কর্মসূচিতে আরও বেশি মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানো, জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত পারকুরসুপ ব্যবস্থার সংস্কার বা বিলুপ্তি। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও শিক্ষক স্বল্পতার কারণে শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সরকারের উদ্যোগ, তবু সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা : আন্দোলনের মধ্যে ফ্রান্সের শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে প্রায় তিন হাজার যোগ্য বিকল্প শিক্ষককে জরুরিভিত্তিতে কাজে যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট সবচেয়ে বেশি, সেখানে এসব শিক্ষক পাঠানো হবে। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত এলাকার স্কুলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ এ উদ্যোগকে প্রাথমিক সাফল্য হিসেবে দেখলেও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো আন্দোলন প্রত্যাহার করেনি। তাদের মতে, শিক্ষকসংকট মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা প্রয়োজন হলেও এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের বিষয়টি স্বীকার করে অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক সিদ্ধান্ত জানানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ১০ বিলিয়ন ইউরোর পূর্ণাঙ্গ দাবির বিষয়ে সরকার এখনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে সরকারের ঘোষিত পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বিক্ষোভের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন হিসাব : গত বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি হিসাব ও আন্দোলনকারীদের মূল্যায়নে পার্থক্য রয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ওই দিন দেশজুড়ে ৭১ হাজার ৫০০ মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। এর মধ্যে প্যারিসে অংশ নেন প্রায় ২৪ হাজার ৫০০ জন। এ ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পৃথক কর্মসূচিতে আরও প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

তবে ৬ অক্টোবরের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল আরও বেশি। সরকারি হিসাবে সেদিন দেশজুড়ে দুই লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আয়োজকদের হিসাবে এ সংখ্যা ছিল প্রায় চার লাখ ৫০ হাজার। দুই দিনের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, আন্দোলনের জনসমাগম ওঠানামা করলেও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রাখতে চায়।

৮ অক্টোবরের বিক্ষোভের সময় প্যারিসসহ কয়েকটি স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। লে মোঁদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্দোলনের আগের দিনগুলোতে পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং আহত কিশোর শিক্ষার্থীদের ঘটনা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জনসমাবেশ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জামের কারণে গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় তদন্তও শুরু হয়েছে।

শিক্ষক স্বল্পতা ও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ : চলমান আন্দোলনের পেছনে শুধু তাৎক্ষণিক অসন্তোষ নয়, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সমস্যাও কাজ করছে। রয়টার্সের ৯ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সের সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট পাঠদানের প্রায় ১০ শতাংশ সময় শিক্ষক পাওয়া যায়নি। অনুপস্থিত শিক্ষকদের বিকল্প শিক্ষক দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে না পারা এর অন্যতম কারণ।

একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ, শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি বিদ্যালয়ে পাঠদানের অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে কিছু পরিবার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলোর সন্তানদের তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে।

ফলে আন্দোলনটি এখন কেবল শিক্ষক নিয়োগ বা বাজেট বৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং শিক্ষার সুযোগে সমতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এসেছে।

১৩ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে নজর : আন্তঃইউনিয়ন জোটের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও ধর্মঘটের মাধ্যমে সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় স্কুলের পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট পরিষেবায় বিঘœ ঘটতে পারে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ থাকবে, তা স্থানীয় পরিস্থিতি ও কর্মীদের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে।

ফ্রান্সের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির জবাব দিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কাটানো; অন্যদিকে বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ ও বাজেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা। সরকার ঘোষিত জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয় কি না, তা নির্ধারণ করবে আন্দোলনের পরবর্তী গতিপথ।

১৩ অক্টোবরের কর্মসূচি তাই শুধু আরেকটি বিক্ষোভের দিন নয়; ফ্রান্সের সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকার এবং তরুণ প্রজন্মের দাবির প্রতি সরকারের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা যাচাইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।