শ্রম অভিবাসন থেকে কৌশলগত অংশীদারত্বে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ক

বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের সম্পর্ককে প্রচলিত শ্রম অভিবাসনের গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নীতিনির্ধারক ও গবেষকেরা। এ জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং অভিবাসী কর্মীদের অধিকার সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

শনিবার (১০ অক্টোবর) ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমির মাল্টিপারপাস হলে ‘কর্মশক্তি থেকে কৌশলগত অংশীদারত্ব: বাংলাদেশ–সৌদি আরব সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস) ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) যৌথ উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বিশেষ অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) ও আইজিএম (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম।

বিআইআইএসএসের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল এ. এস. এম. রিদওয়ানুর রহমান স্বাগত বক্তব্য দেন এবং সেমিনার সঞ্চালনা করেন। তিনি বাংলাদেশ-সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা তুলে ধরে দক্ষ জনশক্তি অভিবাসন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সেমিনারের সূচনাপর্বে এনএসইউর উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী বক্তব্য দেন। তিনি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাগত দক্ষতা এবং পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশের কর্মীদের প্রস্তুত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ আয়োজন নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের কার্যকর ধারণা প্রদান এবং দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের বাস্তবসম্মত পথ চিহ্নিত করতে সহায়ক হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনএসইউর রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান এবং একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজের সমন্বয়ক ড. সেলিম রেজা।

ড. মোহাম্মদ নুরুজ্জামান বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ এবং মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের কৌশলগত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেন। অন্যদিকে, ড. সেলিম রেজা প্রচলিত জনশক্তি রপ্তানিনির্ভর সম্পর্ক থেকে দক্ষতাভিত্তিক অংশীদারত্বে উত্তরণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে ন্যায্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, কর্মীদের অধিকার, পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. রাশেদ উজ জামান এবং বিআইআইএসএসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. বেনুকা ফেরদৌসী।

ড. রাশেদ উজ জামান মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডেটা অবকাঠামোর মতো উদীয়মান খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন। ড. বেনুকা ফেরদৌসী শ্রম অভিবাসনের গন্তব্য বহুমুখীকরণ, সৌদি আরবের পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার নীতি—বিশেষত নিটাকাত কর্মসূচি—সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জন এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি প্রতিষ্ঠান, অভিবাসী কর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, শিক্ষাঙ্গন, যুব সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় শ্রম অভিবাসন, বিনিয়োগ, বাণিজ্যের বহুমুখীকরণ, কর্মশক্তির দক্ষতা উন্নয়ন এবং দুই দেশের জন্য পারস্পরিক সুফল নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।

বিশেষ অতিথি ড. মো. নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ককে প্রচলিত শ্রম অভিবাসনের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর কৌশলগত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বিনিয়োগ, দক্ষ কর্মসংস্থান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টার খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এগিয়ে নিতে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়, কার্যকর তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

প্রধান অতিথি হুমায়ুন কবির পারস্পরিক আস্থা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তিতে সমন্বিত অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি কৃষি, যোগাযোগ, লজিস্টিকস, সরবরাহব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অন্যান্য উদীয়মান খাতে দুই দেশের সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতায় কর্মীদের অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন।

সমাপনী বক্তব্য দেন এনএসইউর সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (এসআইপিজি) পরিচালক অধ্যাপক শেখ তৌফিক এম. হক। তিনি বাংলাদেশের অভিবাসী কর্মীদের মর্যাদা ও অর্থনৈতিক অবদানের কথা তুলে ধরে তাঁদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

সেমিনারটি সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে নীতিগত সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর প্রেক্ষাপটে প্রচলিত শ্রম অভিবাসননির্ভর সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ককে আরও বহুমুখী, পারস্পরিক সুবিধাভিত্তিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার বিভিন্ন সম্ভাবনা এতে আলোচিত হয়।