শরীর মনকে নিয়ন্ত্রণ করে নাকি মন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে, এ নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু এ দুইয়ের কোনোটিই একজন পূর্ণাঙ্গ সুস্থ মানুষের জন্য কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, মানসিক সুস্থতা মানবদেহকে অনেক উপসর্গ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। উন্নত দেশে তো বটেই, অনেক উন্নয়নশীল দেশেও মানসিক স্বাস্থের ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থান কোন পর্যায়ে এর উদ্বেগজনক সাক্ষ্য মিলেছে ১০ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে ‘মানসিক স্বাস্থ্য চরম অবহেলিত জরিপ হয় না সাত বছর’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত। অনেকে যান না অবহেলা করে। আবার সেবা সহজলভ্য না হওয়ায় অনেকে এই পথেই যেতে চান না। দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল রাজধানী ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রয়েছে চিকিৎসক এবং জনবল সংকটও। দেশে এই মুহূর্তে কত মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছেন, তার নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। সর্বশেষ ২০১৯ সালের জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় তিন কোটির মতো মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন।
প্রতিবেদনের সূচনা অংশটুকুতেই প্রতীয়মান হয় জনস্বাস্থ্যের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অবহেলার কোন পর্যায়ে আছে। মানসিক রোগ চিকিৎসায় যেসব প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান তা স্বাস্থ্য মন্ত্রলালয়সহ সংশ্লিট দায়িত্বশীল কোনো পক্ষেরই অজানা থাকার কথা নয়। আমাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনেকেই মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়েছেন, ভুগছেন এই বাস্তবতাও এড়ানোর অবকাশ নেই। মানসিক সমস্যা থেকে আত্মহত্যার মতো মর্মন্তুদ ঘটনাও ঘটছে। আমাদের দেশে বছরে প্রায় ১৩ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে!১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক’। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধির সাধুবাদ জানাই।
আমরা জানি, আমাদের স্বাস্থ্য খাতে অনেক ক্ষত আছে। সামর্থ্য-সীমাবদ্ধতা যেটুকু আছে এর মধ্যেও যা করা যায় তা নিয়েও আছে অন্তহীন প্রশ্ন। সেবাকে পুঁজি করে শুধু বাণিজ্যই নয়, কদাচার-অনাচারের ছড়াছড়ির নজির অনেক। অনিয়ম-দুর্নীতি এখনো স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম উপসর্গ। এই প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়টি কতটা গুরুত্ব পেতে পারে তা ধারণার বাইরে নয়। ‘দৃশ্যত স্বাস্থ্যবান অথবা নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য। সুতরাং, কোনোভাবেই মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই’ প্রধানমন্ত্রীর এই উপলব্ধি আরও গুরুত্ববহ। কাজেই এ ব্যাপারে জনপরিসরে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি সেবা সহজলভ্য করা জরুরি। আমরা বিশ্বাস করি, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে সরকারের সদিচ্ছার অভাব নেই। তবে তা বাস্তবায়ন করতে হলে দক্ষ জনবল এবং বাজেট স্বল্পতা দূর করতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়ানো যায়, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার সুযোগ তৈরিসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়াতে হবে। চিকিৎসাবিষয়ক বিভিন্ন কোর্স, কারিকুলাম এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সংযোজন করাও জরুরি। পারিপার্শ্বিক নানা কারণে সারা বিশ্বেই মানসিক স্বাস্থ্য এখন চরম উদ্বেগের বিষয়। কেবল শরীরের রোগ সারিয়ে সুস্বাস্থ্য অর্জন সম্ভব নয়।
রোমান সম্রাট ও দার্শনিক মার্কাস অরেলিয়াস অ্যান্টোনিনাস যথার্থই বলেছেন, ‘ভেতরের দিকে তাকাও, সমস্ত কল্যাণের উৎস ভেতরেই নিহিত আছে। এমন একটি ঝরনা, যেখানকার প্রবাহিত জল কখনো ফুরাবে না যদি তুমি গভীরে থেকে গভীরে খনন করতে থাকো’। তার এই উক্তিটির জন্য যে উর্বর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি দরকার এর নিশ্চিতকরণে করণীয় রয়েছে দায়িত্বশীল সবার। এর পাশাপাশি আমরা মনে করি, মানসিক স্বাস্থ্যের সুস্থতা শুধু চিকিৎসায় নিশ্চিত হবে না। মানবিক মর্যাদার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রে অধিকারের ভূমি সমতল করাও জরুরি। ভয়, লজ্জা, কুসংস্কারের ছায়া সরানোও সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় চাই সম্মিলিত প্রত্যয়।