পাইরেটেড সফটওয়্যারের বদলে ওপেন-সোর্স

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ এএম

আগামী ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা ছিল বাংলাদেশের। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সময়সীমা আরও তিন বছর পেছাতে পারে। ফলে কয়েক দশক ধরে পাইরেটেড সফটওয়্যারের ব্যাপক ব্যবহার অনুমোদন করার কারণে যে শত শত কোটি ডলারের দায় তৈরি হয়েছে, তা সংশোধনে কিছুটা সময় পাব। সমস্যাটি অধিকাংশ মানুষের ধারণার চেয়ে বড়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০২৫ সালে বলেছিল, বাংলাদেশে ৯.২ শতাংশ পরিবারে কম্পিউটার রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘2020 Investment Climate Statements : Bangladesh’ শীর্ষক প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছিল, ‘ব্যবসায় ব্যবহৃত সফটওয়্যারের ৯০ শতাংশ পাইরেটেড।’ এই হারে আমরা ধরতে পারি যে,  প্রায় ৩৪ লাখ কম্পিউটারে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ এবং এমএস অফিসের পাইরেটেড কপি রয়েছে। পাইরেটেড সফটওয়্যার বলতে সংজ্ঞাগতভাবে এমন সফটওয়্যার বোঝায়, যার জন্য মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে না; কিন্তু আইনগতভাবে প্রত্যেক ব্যবহারকারী এর মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যার অর্থ হলো, সামগ্রিকভাবে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার ব্যবহারের বিপরীতে বাংলাদেশের অপরিশোধিত আর্থিক দায় রয়েছে। যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ এর মূল্য পরিশোধের দাবি জানাবে, তখন মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। ফলে সফটওয়্যার পাইরেসির কারণে বার্ষিক আর্থিক দায়ের পরিমাণ হিসাব করা প্রয়োজন।

একটি কম্পিউটারের জন্য এমএস উইন্ডোজ ১১ প্রোর আনুষ্ঠানিক মূল্য,  প্রায় ১০,৫০০ টাকা। যদি একটি কম্পিউটারের গড় আয়ুষ্কাল ১০ বছর ধরা হয়, তাহলে এর বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় ১,০৫০ টাকা। অধিকাংশ বাসাবাড়ির কম্পিউটারে সাধারণত মাইক্রোসফট অফিস ইনস্টল করা থাকে। যার আনুষ্ঠানিক মূল্য বছরে প্রায় ৯,৭০০ টাকা। ফলে এই দুটি সফটওয়্যারের জন্য প্রতি কম্পিউটারে বার্ষিক খরচ কত কোটি দাঁড়াবে? বাস্তবে হিসাবটি রক্ষণশীল। কারণ এখানে শুধু বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত কম্পিউটারে সফটওয়্যার পাইরেসির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য কম্পিউটার হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অ্যাডোবি ফটোশপ ইমেজ এডিটর এবং অ্যাডোবি ইলাস্ট্রেটর ড্রয়িং টুলের মতো অন্যান্য সফটওয়্যারের ব্যাপক পাইরেসি হিসাবের বাইরে রয়েছে। এসব অন্তর্ভুক্ত করলে, সফটওয়্যারের অপরিশোধিত আর্থিক দায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। মজার বিষয় হলো, পাইরেটেড মাইক্রোসফট সফটওয়্যারের বার্ষিক লাইসেন্সিং খরচের পরিমাণ বোয়িং বিমান ক্রয়ের বার্ষিক খরচের কাছাকাছি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোয়িং বিমান কিনতে ৩.৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। যদি ধরা হয়, বিমান সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া ১০ বছর চলবে, তাহলে বছরে খরচ হবে ৩৭০ মিলিয়ন ডলার। প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে এর পরিমাণ দাঁড়াবে বছরে ৪,৬২৫ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অ্যাডোবি সফটওয়্যারের অতিরিক্ত খরচ যোগ করলে সফটওয়্যার লাইসেন্সিংয়ের ব্যয়, বোয়িং বিমান কেনার বার্ষিক ব্যয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে। বোয়িং বিমান কেনার অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে, তা নিয়ে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু পাইরেটেড সফটওয়্যারের কারণে তৈরি হওয়া আর্থিক দায় সম্পর্কে অনেকে সচেতন নন।  বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদায় উত্তরণের পথে। এই উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে দেশকে মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত এমন একাধিক আর্থিক দায়ের মুখোমুখি হতে হবে, যেগুলো আগে উপেক্ষিত হয়েছে। সফটওয়্যার পাইরেসি সম্ভবত এমন একটি অপরিশোধিত দায়, যা হঠাৎ করে পরিশোধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না। অথচ পাইরেটেড সফটওয়্যারের আর্থিক দায় শূন্যে নামানো সম্ভব। এ জন্য শুধু পাইরেটেড এমএস উইন্ডোজ ও এমএস অফিসের পরিবর্তে বিনামূল্যের ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার Linux Mint Ges LibreOffice  আর পাইরেটেড Adobe Photoshop ও Illustrator -এর পরিবর্তে GIMP ও  Inkscape ডাউনলোড ও ইনস্টল করতে হবে।

কাজী ফার্মসের মতো প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ১,৫০০টির বেশি কম্পিউটার ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে স্থানান্তর করেছে এবং এর মাধ্যমে লাইসেন্স ফি বাবদ, কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর লিনাক্সে অভ্যস্ত হতে প্রায় ১৫ মিনিটের প্রশিক্ষণ লাগে এবং LibreOffice-এ অভ্যস্ত হতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। ওয়ার্ড প্রসেসর, স্প্রেডশিট এবং প্রেজেন্টেশন মডিউলের জন্য প্রায় ২০ মিনিট করে। ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার নিয়ে অসংখ্য ব্যবহারকারী ফোরাম, ম্যানুয়াল এবং ভিডিও রয়েছে, যার সাহায্যে যে কেউ এসব সফটওয়্যার ব্যবহার শিখতে পারেন। বাস্তবে এগুলো মাইক্রোসফটের বিকল্প সফটওয়্যারগুলোর সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ। একইভাবে Photoshop ও Illustrator ব্যবহারে অভ্যস্ত শিল্পী ও গ্রাফিক ডিজাইনারদের GIMP ও Inkscape শিখতেও মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে। কাজী ফার্মস ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি এবং গোপালগঞ্জের কাজী জহুরুল হক কলেজকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে Windows থেকে Linux -এ স্থানান্তরে সহায়তা করেছে। এর জন্য শুধু আইটি সাপোর্ট কর্মীদের Windows-এর পরিবর্তে Linux-এর ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। সরকার সব সরকারি কম্পিউটার Linux ও LibreOffice -এ স্থানান্তরের মাধ্যমে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে রূপান্তরকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে সব সরকারি নথি Microsoft Office-এর ফাইল ফরম্যাট  docx, .xlsx I .pptx-এর পরিবর্তে LibreOffice-এর ফাইল ফরম্যাট-ডকুমেন্টের জন্য .odt, স্প্রেডশিটের জন্য .ods এবং প্রেজেন্টেশনের জন্য .odp এ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে এমএস সফটওয়্যারের লাইসেন্স না কিনেও, সব সরকারি নথি নির্বিঘ্নে পড়া ও সম্পাদনা সম্ভব হবে। সব স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়কে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে স্থানান্তরে উৎসাহিত করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা মালিকানাধীন সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারের সঙ্গে পরিচিত হয়। 

লেখক : পরিচালক কাজী ফার্মস লিমিটেড

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত