মায়ের গর্ভ রহস্যময়

মানুষের জীবনের শুরু ছিল খুবই ক্ষুদ্র ও অসহায় অবস্থায়। মায়ের গর্ভে নির্ভরশীল এক অস্তিত্ব থেকে ধীরে ধীরে সে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয়েছে। নিজের এই শুরুর কথা মনে রাখলে মানুষের অহংকার কমে এবং স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়ে। কোরআন ও হাদিস মানুষের এই সূচনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে নিজের সৃষ্টি, মায়ের ত্যাগ এবং জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য নিয়ে ভাবতে শেখায়।

কোরআনে সৃষ্টির বিস্ময় : মহান আল্লাহ মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে বলেন, ‘আমি তো মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে এক নিরাপদ স্থানে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করেছি। তারপর শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি। অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি। তারপর মাংসপিণ্ড থেকে অস্থি সৃষ্টি করেছি এবং অস্থিকে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি। অতঃপর তাকে অন্য এক সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলেছি। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!’ (সুরা মুমিনুন ১২-১৪)

মানুষের সৃষ্টির এই পর্যায়গুলো আমাদের নিজের অস্তিত্বের দিকে তাকাতে শেখায়। আজ যে মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি নিয়ে গর্ব করে, তার নিজের যাত্রা শুরু হয়েছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র এক অবস্থা থেকে। তার অস্তিত্বের প্রতিটি ধাপই ছিল আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মের অধীন।

মায়ের গর্ভ নিরাপদ আশ্রয় : মহান আল্লাহ মানুষের প্রাথমিক অবস্থানকে বলেছেন ‘নিরাপদ স্থান’। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় সন্তান নিজের কোনো প্রয়োজন নিজে পূরণ করতে পারে না। সে খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না, নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে না, এমনকি নিজের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গও নিজে তৈরি করতে পারে না। অথচ তার বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা এমন নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হতে থাকে, যা মানুষের চিন্তাকে বিস্মিত করে। এ কারণেই মায়ের গর্ভ মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের অনন্য নিদর্শন।

মায়ের ত্যাগ : মায়ের গর্ভের সঙ্গে সন্তানের জীবনের যে সম্পর্ক, তা শুধু জন্মের মাধ্যমে শুরু হয়নি, বরং গর্ভধারণের মুহূর্ত থেকেই মায়ের ত্যাগের সূচনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করে।’ (সুরা লুকমান ১৪)

অপর স্থানে মহান বলেন, ‘তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে।’ (সুরা আহকাফ ১৫)

মায়ের এই ত্যাগের কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্তানের কাছে মায়ের মর্যাদাকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, আমার সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবার জিজ্ঞাসা করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তৃতীয়বারও একই প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, তোমার মা। চতুর্থবার জিজ্ঞাসা করলে বললেন, তোমার বাবা। (সহিহ বুখারি ৫৯৭১)

মায়ের প্রতি ইসলামের এই বিশেষ মর্যাদা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সন্তানের অস্তিত্বের সঙ্গে মায়ের ত্যাগ কত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

দুর্বলতা থেকে শক্তি : মানুষের জীবনের সূচনা হয় দুর্বলভাবে। শৈশবেও সে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যৌবনে এসে শক্তিশালী হয়। আবার বার্ধক্যে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের দুর্বল অবস্থায় সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তি দিয়েছেন। অতঃপর শক্তির পর দুর্বলতা ও বার্ধক্য দিয়েছেন।’ (সুরা রুম ৫৪)

এই আয়াত মানুষের অহংকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, তার শুরু ও শেষ উভয়ই তাকে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

পৃথিবী স্থায়ী ঠিকানা নয় : মায়ের গর্ভ ছিল আমাদের প্রথম ঠিকানা। পৃথিবী হলো পরবর্তী ঠিকানা। কিন্তু পৃথিবী আমাদের চূড়ান্ত ঠিকানা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো যেন তুমি একজন অপরিচিত অথবা পথিক।’ (সহিহ বুখারি ৬৪১৬)

এই সংক্ষিপ্ত ও গভীর হাদিসটি মানুষকে দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে এবং আখেরাতের প্রস্তুতির দিকে মনোযোগী হতে শেখায়।

নিজের মধ্যেই স্রষ্টার নিদর্শন : মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের মধ্যেও নিদর্শন রয়েছে, তোমরা কি দেখতে পাও না?’ (সুরা জারিয়াত ২১)

মানবদেহ নিজেই এক বিস্ময়কর জগৎ। একটি ক্ষুদ্র সূচনা থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হওয়া, হৃদয়ের স্পন্দন, চোখের দৃষ্টি, কানের শ্রবণশক্তি, মস্তিষ্কের জটিল কার্যক্রম, সবকিছু মানুষকে স্রষ্টার কুদরত নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ দেয়।

কোরআনের শিক্ষা হলো, সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা মানুষকে স্রষ্টার পরিচয়ের দিকে নিয়ে যায়, যদি সেই চিন্তার সঙ্গে থাকে ইমান ও উপলব্ধি।

লেখক : আরবি প্রভাষক, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম