সিজেপির বিক্ষোভে পুলিশি দমন

ভারতে চলছে বিশাল পরিসরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ। এর লক্ষ্য মৃত, একাধিকবার নিবন্ধিত ও ভোট দেওয়ার অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নামও বাদ পড়ে যেতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিরোধীদের অভিযোগ, এটি সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতেও প্রভাব ফেলেছে। আর এই উদ্বেগের কারণেই ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর এখন ভারতের অন্যতম তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ১৪ বার এসআইআর প্রক্রিয়ার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন ভারতের দুই নির্বাচন কমিশনার। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এসব আপত্তি ছিল তাদের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ। একই সঙ্গে কমিশন দাবি করেছে, শেষ পর্যন্ত সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে। এই তথ্য সামনে আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ও আন্দোলনে নামে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া মোদির ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে তারা টানা কয়েক দিন বিক্ষোভও করেছে।

স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন কী : এসআইআর শুরু হয় ২০২৫ সালের জুনে। দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ভারতের অধিকাংশ অঞ্চলে এটি প্রথম নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া। তবে প্রতি বছর যে নিয়মিত সংশোধন করা হয়, তার সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার বড় পার্থক্য আছে। নিয়মিত সংশোধনে সাধারণত নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করা হয় এবং ঠিকানা বা অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করা হয়। কিন্তু এসআইআরে ভোটারদের যোগ্যতা অনেক বিস্তৃতভাবে নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। বর্তমান ভোটারদের তথ্য ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে পরিচালিত আগের নিবিড় সংশোধনের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো কারা মারা গেছেন, কারা অন্য জায়গায় চলে গেছেন, কার নাম একাধিকবার রয়েছে এবং কাদের তথ্য আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যাচ্ছে না, তা চিহ্নিত করা।

বর্তমান ভোটারদের নিজেদের তথ্যও যাচাই করতে বলা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা প্রমাণের জন্য নথিপত্রও জমা দিতে হচ্ছে। এই কার্যক্রমের পরিসর বিশাল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দুই ডজনের বেশি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, এই ১৩ কোটি ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে মুছে গেছে। তারা দাবি বা আপত্তি জানাতে পারবেন এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন করতে পারবেন।

নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, আগের নিবিড় সংশোধনের পর দীর্ঘ সময়ে মানুষের স্থানান্তর, মৃত্যু এবং একই ব্যক্তির একাধিক নিবন্ধনের ঘটনা জমতে জমতে ভোটার তালিকায় বড় ধরনের অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে। ২০০৪ সালের পর ভারতের জনসংখ্যা কয়েকশ মিলিয়ন বেড়েছে। ফলে ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এই প্রক্রিয়া প্রথম শুরু হয় বিহারে, ২০২৫ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে। নির্বাচন কমিশন তখন বলেছিল, তাদের লক্ষ্য ছিল ভোটার তালিকা নির্ভুল ও হালনাগাদ রাখা। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তামিলনাড়–, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও পুদুচেরিসহ আরও কয়েকটি রাজ্যে পরবর্তী ধাপে এসআইআর পরিচালিত হয়।

এসআইআর বিতর্কিত কেন : নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য অযোগ্য নামগুলো বাদ দেওয়া এবং প্রকৃত ভোটারদের তালিকায় রাখা। কিন্তু সমালোচকদের যুক্তি, এত বিশাল পরিসরে আগে থেকেই নিবন্ধিত ভোটারদের আবার নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে বলা হলে অনেক বৈধ ভোটার ভুলভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের কয়েকটি সংগঠন গত বছর সুপ্রিম কোর্টে এসআইআরকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। তবে মে মাসে আদালত এই সংশোধন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার বহাল রাখে। একই সঙ্গে ভোটারদের সুরক্ষায় বাড়তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার নির্দেশও দেয়।

যেসব রাজ্য নির্বাচনে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি এবং তাদের মিত্ররা জয় পেয়েছে, সেই নির্বাচনগুলোর কাছাকাছি সময়ে এসআইআর পরিচালিত হওয়ায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের বিহারে বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা জয়ী হয়। এরপর এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের আগে এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে জয় পায়; তাও বড় ব্যবধানে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে দরিদ্র ও মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দিচ্ছে। তাদের দাবি, এসব ভোটারের মোদির হিন্দু-প্রধান রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। বিজেপি অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

এসআইআর নির্বাচনের ফলে কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর কিছু বিশ্লেষক দেখিয়েছেন, যেসব এলাকায় বিজেপিবিরোধী ভোটার বেশি, সেখানে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার হারও বেশি ছিল। অন্য বিশ্লেষকরা বলেছেন, ভোটার তালিকার পরিবর্তনের প্রভাব ছিল খুবই সামান্য। তাদের মতে, নির্বাচনের ফল মূলত তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসন নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ থেকে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে জনমতের পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করেছে।

নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতবিরোধ : সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতবিরোধ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন ভারতের নির্বাচন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির ওপর নজরদারি আরও বাড়িয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে দুজন; সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি, ভোটার নিবন্ধন, নাম বাদ দেওয়া, বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল এবং নির্বাচনী ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে আনুষ্ঠানিকভাবে এক ডজনেরও বেশিবার আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়ম লঙ্ঘন করে সংশোধন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন বিষয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; এমন আলাদা অভিযোগও খতিয়ে দেখছে সুপ্রিম কোর্ট।

কাদের বাদ পড়ার ঝুঁকি বেশি : প্রয়োজনীয় নথি নেই, বারবার বাসস্থান পরিবর্তন করেছেন কিংবা যাচাইয়ের সময় সহজে যাদের খুঁজে পাওয়া যায় না এসব ভোটারের জন্য এসআইআর বিশেষ সমস্যা তৈরি করতে পারে। সমালোচকদের মতে, এর ফলে অভিবাসী শ্রমিক, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং কিছু বয়স্ক ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। প্রথমবার ভোটার হতে যাওয়া ব্যক্তিদেরও বাড়তি বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।