স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা দেশেই ভালো

স্তন ক্যানসার নারীদের কাছে আতঙ্কের বিষয়। পুরুষের চেয়ে নারীদের স্তন ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অনেক নারী নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীন থাকেন। আবার সহজে কারও কাছে বলতে দ্বিধাবোধ করেন। স্তন ক্যানসার হলো কোষের অপরিণত বৃদ্ধি। স্তন কোষের অনিয়মিত বিভাজনের ফলে এটি টিউমার বা পি-ে পরিণত হয়। রক্তনালির লাসিকার মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।

কেন হয়

অনেক কারণে স্তন ক্যানসার হতে পারে। অতিরিক্ত ওজনও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। দেরিতে সন্তান গ্রহণ, সন্তান না থাকা, কিংবা সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি বা ফলমূলের চেয়ে চর্বি ও প্রাণিজ আমিষ বেশি থাকলে এবং প্রসেসড ফুড বেশি খেলে স্তন ক্যানসারের আশঙ্কা বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পিল খাওয়া বা হরমোনের ইনজেকশন নেওয়া, স্তন ক্যানসারের অন্যতম কারণ। বয়স ৫০ বছর পর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। কারও যদি বারো বছরের আগে ঋতুস্রাব হয় এবং দেরিতে মেনোপজ বা ঋতু বন্ধ হয়, তারাও এ ঝুঁকিতে থাকেন। স্তনের আকারের চেয়ে বড় মাপের ব্রা স্তনের টিস্যুগুলোকে ঠিকমতো সাপোর্ট দিতে পারে না। আবার অতিরিক্ত ছোট বা টাইট ব্রা স্তনের তরলবাহী লসিকাগুলো কেটে ফেলতে পারে। এটাও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

এ ছাড়া সারাক্ষণ ব্রা পরে থাকার কারণে ঘাম নির্গমনে বিগ্ন ঘটে, ফলে আর্দ্রতা জমে। এ কারণে স্তন ক্যানসার হতে পারে। ডিওডোরেন্ট এলুমিনাম বেসড উপাদান থাকলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে। অতিমাত্রায় অ্যালকোহল, তামাক সেবনের ফলেও স্তন ক্যানসার হতে পারে। বংশে এর আগে কারও ব্রেস্ট বা ওভারি ক্যানসার থাকলে বা বিএআরসিএ ১, ও বিএআরসি ২, জিন থাকলে ব্রেস্ট ক্যানসারের ঝুঁকি অনেক বেশি।

লক্ষণ

স্তনবৃন্ত থেকে অল্প অল্প দুধের মতো জলীয় পদার্থ নিঃসরণ হচ্ছে। অনেক সময় স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত পড়তেও দেখা যায়। কোনো র‌্যাশ ছাড়াই চুলকানির অনুভূতি, এটি স্তন ক্যানসারের অন্যতম লক্ষণ। স্তনে টিউমার থাকলে তা আশপাশের টিস্যুগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং এর ফলে স্তনে ফোলা ভাব দেখা যায়। কাঁধ এবং ঘাড়ের ব্যথাও ব্রেস্ট ক্যানসারের লক্ষণ। কারণ এটি স্তন থেকে খুব সহজেই শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। স্তনবৃন্ত চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, বেঁকে যাওয়া বা স্তনবৃন্তের আকার অসমান হয়ে যাওয়া ক্যানসারের লক্ষণ। স্তনে ছোট ছোট ফুসকুড়ির মতো লাম্প হওয়া। এই ব্রেস্ট লাম্পগুলো অনেক সময় আন্ডারআর্ম বা কলার বোনের তলাতেও দেখা যায়, যেগুলো টিপলে শক্ত অনুভূত হয়। অন্তর্বাস পরে থাকার সময় যদি ঘর্ষণ অনুভব করেন, এবং ব্যথা লাগে তবে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।

স্তনবৃন্ত খুবই সংবেদনশীল অংশ। যদি দেখেন স্তনবৃন্ত স্পর্শ করার পরও তেমন কোনো অনুভূতি হচ্ছে না, তবে তা ব্রেস্ট ক্যানসারের লক্ষণ। স্তনের ত্বকে লালচে আভা এবং অমসৃণতা দেখা দেওয়া। এটা অ্যাডভান্সড ব্রেস্ট ক্যানসারের লক্ষণ। স্তনবৃন্তে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয়, যেমন স্তনবৃন্ত দেবে যাওয়া, চুলকানি, জ্বালাপোড়া, চামড়া ওঠা, ক্ষত কিংবা ঘা-এর উপস্থিতি।

কীভাবে পরীক্ষা করবেন

বিশ বছরের পর থেকে প্রত্যেক নারীর উচিত প্রতি মাসে নির্দিষ্ট সময়ে নিজের স্তন পরীক্ষা করা। মাসিক শুরুর ৫-৭ দিন পর এই পরীক্ষা করার উপযুক্ত সময়। কারণ তখন স্তন নরম ও কম ব্যথা থাকে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা : আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তনকে চারটি ভাগে ভাগ করে প্রতিটি অংশের অভ্যন্তরে কোনো চাকা বা দলার মতো আছে কিনা তা অনুভব করুন। হাত দুটো পাশে রাখুন এবং ভালো করে লক্ষ্য করুন স্তনের চামড়ায় কোনো পরিবর্তন কিংবা আকারে কোনো তারতম্য এসেছে কিনা। এবার দুই হাত কোমরে রেখে বুক সামনের দিকে চিতিয়ে দেখুন স্তনে কোনো ধরনের দাগ, ঘা কিংবা গর্ত আছে কিনা। এবার হাত দুটো উঁচু করে আরও একবার পরীক্ষা করুন। এক্ষেত্রে আপনি নিপল থেকে শুরু করে বৃত্তাকারভাবে বাইরের দিকে ওপর-নিচ করে সম্পূর্ণ স্তন পরীক্ষা করতে পারেন।

গোসলের আগে একটি হাত মাথায় রাখুন : আরেকটি হাতের আঙুল দিয়ে কলার বোনের কয়েক ইঞ্চি নিচ থেকে একদম বগল পর্যন্ত চেপে দেখুন, পুরো স্তনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চক্রাকারে পরীক্ষা করতে থাকুন, প্রথমে হালকাভাবে, পরে একটু চাপ দিয়ে স্তনের টিস্যুগুলো পরীক্ষা করুন।

রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা

যাদের পরিবারে কারও স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে এমন ঘটনা আছে। তাদের হাসপাতালে গিয়ে ম্যামোগ্রাম করতে হবে। ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের নির্ধারিত বিরতিতে এক, দুই বা তিন বছর পরপর নিয়মিতভাবে ম্যামোগ্রাম করা হয়। এ ছাড়া ইমেজিং পরীক্ষার মধ্যে রয়েছে আলট্রাসাউন্ড, এমআরআই (গজও) এবং সার্জিক্যাল টেস্টের মধ্যে বায়োপসি (নরঢ়ংু) অন্যতম। সিইএ (ঈঊঅ), সিএ-১৫-৩ (ঈঅ-১৫-৩), বা সিএ-২৭.২৯ টেস্ট ও রক্তের সিবিসি (ঈইঈ) পরীক্ষারও প্রয়োজন পড়ে।

চিকিৎসা

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় সার্জারি প্রথম উপায়। টিউমার ও তার আশপাশের কিছু টিস্যু কেটে এই অপারেশন করা হয়। মাস্টেক্টমি এই অপারেশনে স্তন এবং এর নিচের মাংসপেশি, বগলের লসিকাগ্রন্থিসহ আনুষঙ্গিক আক্রান্ত টিস্যু কেটে ফেলা হয় কিংবা সম্পূর্ণ স্তন কেটে ফেলা হয়। কোন কোন রোগীর স্তনের চামড়া সংরক্ষণ করে বিকল্পভাবে স্তন পুনর্গঠন করা হয়। শরীরের অন্য জায়গা থেকে মাংসপেশি কেটে নিয়ে স্তনের আকার করে স্তনের জায়গায় পুনঃস্থাপন করার মাধ্যমে এটি করা হয়। র‌্যাডিক্যাল ম্যাস্টেক্টমির মাধ্যমে বুকের দেয়ালের মাংসপেশি, বগলের নিচে লিম্ফনোডসহ পুরো স্তন কেটে বাদ দেওয়া হয়। ক্যানসার কোষ লিম্ফনোডে পৌঁছে তার মাধ্যমে শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। সেন্টিনেল নোড বায়োপসির মাধ্যমে লিম্ফনোড সরিয়ে ফেলা হয়। একে বলা হয় অ্যাক্সিলারি লিম্ফনোড ডিসেকশন।

 রেডিওথেরাপি হলো তেজস্ক্রিয় রশ্মি প্রয়োগ করে শরীরের ক্যানসারের কোষ নির্মূল করা হয়। তা ছাড়া দেহের অভ্যন্তরে তেজস্ক্রিয় পদার্থ স্থাপন করেও চিকিৎসা করা যায়। স্তন ক্যানসার চিকিৎসায় অপারেশন পরবর্তী সময়ে অ্যাডভান্স কেমোথেরাপি দেওয়া হয়ে থাকে। এতে ক্যানসার কোষের পুনরাবির্ভাবের ঝুঁকি থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে টিউমার বেশি বড়  থাকলে কেমোথেরাপি অপারেশনের আগে নিতে হতে পারে। সাধারণত ৬-৮টি ডোজ (প্রতি মাসে একটি করে) বা রক্তনালির মাধ্যমে ইনজেকশন দেওয়া হয়। কেমোথেরাপি ইস্ট্রোজেন তৈরি বন্ধ করতে সাহায্য করে। ইস্ট্রোজেন স্তন ক্যানসারের জন্য দায়ী।

বায়োলজিক্যাল ইম্যুনোথেরাপি সার্জারি, রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি তুলনায় বহুল ব্যবহৃত প্রযুক্তি। বায়ো-ইম্যুনোথেরাপির মাধ্যমে রোগীর রক্ত সংগ্রহ করে, ইমিউনোলজিক সেল (ডিসি-সিআইকে) তৈরি করা হয়। এরপর এ সংগৃহীত রক্ত রোগীর শরীরে পুনরায় প্রবেশ করিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

এটি ক্যানসার কোষকে সরাসরি ধ্বংস করে মেটাস্টিসিস রোধ করে থাকে।

ডা. আফরোজা ইসলাম

স্তন ও পায়ুপথ রোগ বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল