কখনো কথা হয়নি, পরিচয় ঘটেনি, কেবল এক মুহূর্তের দৃষ্টি বিনিময়। অথচ এখনো ভুলতে পারেননি সেই অদ্ভুত চাহনি! এমনটা হয় না? হয় অনেক সময়, অনেকের ক্ষেত্রেই। চেনা-অচেনার মাঝখানে কখনো কখনো চোখই তৈরি করে দেয় সবচেয়ে ছোট অথচ সবচেয়ে গভীর সেতু। বাস্তব সেই অভিজ্ঞতা যখন আলোকচিত্রের ফ্রেমে এসে ধরা দেয়, তখন তাকে আমরা বলি ‘আই কনট্যাক্ট’। ছবি তোলার সময় কোনো মানুষ কিংবা প্রাণী ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকালে ছবিতে মনে হয়, ফ্রেমের ওপার থেকে সে যেন কিছু বলতে চায়। রঙ, অঙ্গভঙ্গি ও পরিবেশ পেরিয়ে তার চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা আবেদনটুকুই তখন দর্শককে বেশি স্পর্শ করে।
আর সেই চোখের তারায় আলোর উৎসের ক্ষুদ্র প্রতিফলনটুকুই আলোকচিত্রের ভাষায় ‘ক্যাচ লাইট’। আকারে সামান্য হলেও ছবির অনুভবে তার ভূমিকা অসামান্য। এই এক বিন্দু আলো চোখে এনে দেয় দীপ্তি, গভীরতা, প্রাণ। সেই আলোটুকু না থাকলে ছবিতে চোখ হয়ে যায় নিষ্প্রভ ও নিস্তেজ। অথচ সঠিক জায়গায় ধরা পড়া সেই ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু চোখকে করে তোলে জীবন্ত যেন চোখের ভেতরেই জ¦লে ওঠে একটি প্রাণপ্রদীপ।
চোখের বাক্সময়তা বেশি আরাধ্য পোর্ট্রটে ফটোগ্রাফিতে হোক সেটা মানুষের কিংবা অন্য কোনো প্রাণীর। আই কনট্যাক্টের পাশাপাশি সাবজেক্টের চোখের তারায় সেই আলোর ঝিলিক ফ্রেমবন্দি করতে সামান্য কারিগরি সচেতনতাও প্রয়োজন। আলোর উৎস যদি চোখের সামনে বা সামান্য পাশে থাকে, তবেই তার প্রতিফলন চোখে ধরা পড়ে। প্রাকৃতিক আলো, খোলা আকাশ, এমনকি আশপাশের উজ্জ্বল কোনো পৃষ্ঠও তৈরি করতে পারে সেই জাদুকরী আলোকবিন্দু। তাই আলো শুধু দৃশ্যকেই উজ্জ্বল করে এমন ভাবলে ভুল হবে; কখন কোথায় তার প্রতিফলন এসে চোখকে জাগিয়ে তুলবে, সেখানেও প্রয়োজন আলোকচিত্রীর গভীর মনোযোগ। তবে ক্যাচ লাইটের সৌন্দর্য তার আকারে নয়, বরং তার স্বাভাবিকতায়। ছবির সবচেয়ে মূল্যবান আলো অনেক সময় ফ্রেমের বাইরে থাকে, কিন্তু তার প্রতিবিম্ব ঠিকই জ¦লে ওঠে চোখের তারায়; আর নির্বাক চোখে তখন জেগে ওঠে ভাষা। এই সত্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে। বাংলাদেশের পাখিপ্রেমী ও বার্ড ফটোগ্রাফারদের কাছে পাতি সবুজ তাউরা যেন বনের এক বর্ণিল রূপকথা লাল, সবুজ আর নীলের এক অপরূপ মেলবন্ধন। তার দেখা পাওয়ার আশায় একবার, দুবার নয় টানা দশবার সাতছড়ি থেকে ফিরেছি শূন্য হাতে। একাদশবারে যখন অপেক্ষার অবসান হলো, তখন দিনের আলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। যে পুকুরপাড়ে তারা দিন শেষের স্নান সারতে আসে, দিনের বেলাতেও জায়গাটি ছায়াঘেরা। বিকেল ফুরোবার আগেই সেখানে ঝুপ করে নেমে আসে অকালসন্ধ্যা।
সেই প্রায়-অন্ধকার মায়াবী লগ্নে হঠাৎ বনের নীরবতা ভেঙে পাখিটির ডাক শোনা গেল। একসময় এসে পুকুরপাড়ে নামল সে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বহু কাক্সিক্ষত সেই মুহূর্ত সামনে পেয়ে আমার বুকের ভেতর তখন খুশির হিল্লোল। রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার মিশেলে, প্রায় অন্ধকারে কাঁপাকাঁপা হাতে যখন শাটার চাপলাম, ছবিটি কতটা নিখুঁত হবে, তা ভাববার অবকাশ তখন কোথায়! বরং সবকিছুকে ছাপিয়ে আমার চোখ আটকে গেল অন্য এক জায়গায় পাখিটির চোখে।
ক্যামেরার দিকে সরাসরি তাকিয়ে থাকা সেই চোখে ছিল বিস্ময়, সতর্কতা আর একটুখানি শঙ্কা। শরীরের আড়ষ্টতাও যেন এসে জমেছিল সেই দৃষ্টিতে। আমরা তাকে বিরক্ত করিনি, তবু আমাদের উপস্থিতি সে টের পেয়েছিল তার চোখই যেন সেই খবরটি জানিয়ে দিল। আর চোখের তারায় জ¦লে থাকা ক্ষুদ্র ক্যাচ লাইটটি সেই নীরব বার্তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। এক বিন্দু আলো, অথচ তার ভেতর যেন কত কথা! যদি সেই মুহূর্তে পাখিটি ক্যামেরার দিকে না তাকাত, ছবিটি হয়তো তার প্রতিকৃতি ধরে রাখত; কিন্তু তার অনুভূতির এতটা কাছে পৌঁছাতে পারত কি?
এখানেই ফটোগ্রাফির সৌন্দর্য তার কারিগরি সীমা ছাড়িয়ে যায়। আই কনট্যাক্ট শুধু ক্যামেরার দিকে তাকানো নয়; কখনো তা হয়ে ওঠে দুই জীবনের মাঝখানে এক মুহূর্তের সাক্ষাৎ। ক্যাচ লাইট শুধু আলোর প্রতিফলন নয়; যেন অন্তহীন জীবনেরও প্রতিচ্ছায়া। আমরা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের মুখোমুখি হই, ক’জনের চোখের দিকে সত্যিই তাকাই? কখনো একটি দৃষ্টি আনন্দের কথা বলে, কখনো ভয়, কখনো ক্লান্তি, আবার কখনো বা নিঃসঙ্গতা। ভাষা সেখানে থেমে যায়; চোখ কথা বলে।
সাতছড়ির সেই সবুজ তাউরা আবার বনের গভীরে ডানা মেলে হারিয়ে গেছে। কিন্তু তার সেই এক মুহূর্তের দৃষ্টি থেমে আছে ছবির ভেতর। সময় পাখিটিকে নিয়ে গেছে অন্য কোনো আলোয়; ফ্রেমে রয়ে গেছে তার চোখের তারায় জ্বলে থাকা এক বিন্দু আলো। ছবি তো আসলে কেবল আলোছায়ার খেলা নয়, ছবি হলো সময়ের বুকে এক চিলতে আবেগের নোঙর। একটি সার্থক প্রতিকৃতি শুধু মানুষ বা প্রাণিটিকেই দেখায় না, তার বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা আবেগটুকুও দেখিয়ে দেয় চোখের তারায়।
লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা