অ্যানিসথিসিয়া চিকিৎসক সংকট

বরিশাল বিভাগে অস্ত্রোপচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যানিসথিসিয়া চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। বিভাগে সরকারি হাসপাতালগুলোতে অ্যানিসথিসিওলজিস্টের অনুমোদিত ৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের বড় একটি অংশই শূন্য। এদিকে অ্যানিসথিসিওলজিস্টের তীব্র সংকটের মধ্যেই বিভাগজুড়ে বাড়ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালে অস্ত্রোপচার। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল না থাকলেও অস্ত্রোপচার থেমে নেই। আর এসব ঘটনায় রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রায়ই তৈরি হচ্ছে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পরিস্থিতি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালগুলোতেই অ্যানিসথিসিয়া চিকিৎসকের প্রায় ৭২ শতাংশ পদ শূন্য। ফলে সরকারি হাসপাতালগুলোতেই যখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, তখন বেসরকারি খাতে দ্রুত বাড়তে থাকা অস্ত্রোপচার কেন্দ্রগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অ্যানিসথিসিওলজিস্ট নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে বরিশাল বিভাগে চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগে অন্তত ১৭ জন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন পাঁচজন। যদিও এসব মৃত্যুর প্রতিটির জন্য চিকিৎসকদের অবহেলাই দায়ী কি না, তা নিয়ে পৃথক তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘অপারেশনের ক্ষেত্রে অ্যানিসথিসিওলজিস্ট একজন অপরিহার্য চিকিৎসক। বরিশাল বিভাগে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে অ্যানিসথিসিওলজিস্টের সংখ্যা খুবই কম। এই সংকটের কারণেই জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে রোগীর মৃত্যুর হার বাড়ছে।’

অ্যানিসথিসিয়া চিকিৎসকের এই সংকটের মধ্যেই বরিশাল নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল নগরীতে তিন ক্যাটাগরিতে অনুমোদিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৩৮টি। নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতাল রয়েছে ৪৩টি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাস্তবে নগরীতে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের সংখ্যা দুই শতাধিক।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, আধুনিক সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। বরিশাল প্রাইভেট ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক কাজী আল মামুন বলেন, ‘কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। একটি অপারেশন থিয়েটারে যে ধরনের সরঞ্জাম ও আধুনিক সুবিধা থাকা প্রয়োজন, অনেক প্রতিষ্ঠানেই তা নেই।’

বরিশালের সিভিল সার্জন সাইয়েদুর রহমান বলেন, ‘ক্লিনিকগুলোতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেগুলোও কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।’ বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. রেফায়েতুল হায়দার বলেন, ‘বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব। অস্ত্রোপচারের সময় একজন সার্জন ও একজন অ্যানিসথিসিওলজিস্ট যেন পুরো সময় উপস্থিত থাকেন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানিসথিসিয়া ব্যবস্থাপনায় সামান্য ভুলও রোগীর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই প্রশিক্ষিত অ্যানিসথিসিওলজিস্ট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা ছাড়া কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা নিরাপদ নয়।