সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ভয়াবহ মিসাইল হামলায় দুজন বাংলাদেশিসহ অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। ১০ অক্টোবর রাতে এই হামলা চালানো হয়। রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, তারা নিহত দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি হামলার পর থেকে আরও ১১ জন বাংলাদেশি নিখোঁজ রয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর অর্থ হচ্ছে তিনি চাইছেন হামলা করতে কিন্তু জনমত জরিপ যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপগুলো সমর্থিত হচ্ছে না। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছেন ট্রাম্প। নির্বাচনের ফলাফলে যদিও সবসময় জরিপের প্রতিফলন ঘটে না, তবে এবার যদি এমনটা ঘটে (বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনায় যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে) তাহলে তিনি নিশ্চিতভাবেই কংগ্রেস এবং সিনেট এই উভয় কক্ষেই তার নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছেন।
মূলত ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টা ট্রাম্পের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার এক ধরনের প্রতিফলন বলা যায়। এর মধ্য দিয়ে তিনি কার্যত তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি নিজ দলের ভেতর এটাই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, ইতিপূর্বে যে কাজটা পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা করতে পারেননি, সেটাই তিনি করে দেখিয়েছেন, যার কারণে মার্কিন ইতিহাসে তার নামটি বিশেষভাবে উচ্চারিত হবে। আর এই পরিকল্পনাটি তার প্রথম মেয়াদেই তিনি করতে চেয়েও সময়াভাবে করে উঠতে পারেননি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মার্কিনিদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই এক ধরনের তীব্র অস্বস্তি থাকার পরও তারা ইরানকে দমাতে গিয়ে কখনো শক্তি প্রয়োগের কথা ভাবেনি। এর মূল কারণ ১৯৭৯ সালের বিপ্লবোত্তর সময়ে ইরানের ইসলামি শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার দৃঢ় ভিত্তি, দেশটির বিশাল আকার, ভৌগোলিক অবস্থা এবং সামরিক সক্ষমতা। এ লক্ষ্যে ২০১৫ সালে দীর্ঘ আলোচনার পর ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পরই এই চুক্তিটি বাতিল করেন, যার মধ্য দিয়ে তিনি ইরানের বিষয়ে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষার প্রথম পরক্ষেপটি নেন। পরবর্তী সময় ইসরায়েলের সহায়তায় ইরানের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ক্রমাগত নজরদারি এবং তাদের অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানীকে হত্যার মধ্য দিয়ে ইরানের বিষয়ে তার অবস্থানের বিষয়টি আরও ভালো করে জানান দেন। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব ছাড়াও ইসরায়েল রাষ্ট্রটি নিয়ে অন্যান্য আরব দেশগুলোর মধ্যে বিবদমান আতঙ্কের মধ্যে ইসরায়েলকে প্রতিষ্ঠিত এবং একে আরও ক্ষমতাশালী করার উদ্দেশ্যে ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কোর এবং সুদানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন। তার এই মেয়াদে এসে তিনি এটিকে আরও সম্প্রসারিত করে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মতো দেশগুলকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সংযুক্ত করতে চাপ প্রয়োগ করে আসছেন।
একদিকে ইরানে চলমান ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ, অন্যদিকে গাজায় স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ গণহত্যা সাধনের পরও ইসরায়েল রাষ্ট্রটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সমর্থন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সরকারের নীতি নিয়ে ব্যাপক জনঅসন্তোষকে পাত্তা না দিয়ে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েলকে পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি সীমাহীন অশান্ত হয়ে উঠেছে। তেলের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১০৪ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। নিজের আত্মরক্ষার তাগিদে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধ থেকে বের করার কৌশল হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করেছে ইরান। এর মাধ্যমে এই বার্তাই দেওয়া হয় যে, বৈশ্বিক তেল পরিবহনের ২০ শতাংশ এর মধ্য দিয়ে ব্যাহত হওয়ার ফলে স্বাভাবিক জ¦ালানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চ্যানেল। উল্লেখ্য, ইরানের শক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তাদের বিভিন্ন প্রক্সি গ্রুপ। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং হুতিদের মতো সংগঠনগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে তারা পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। ইসরায়েলের সঙ্গে গাজা নিয়ে হামাসের যে যুদ্ধ এটা কেবল ফিলিস্তিন ভূখ-ে যেমন ইসরায়েলের অবস্থানকে আরও সুসংহত করাই নয়, বরং ইরানের শক্তিকে দুর্বল করাও অন্যতম উদ্দেশ্য। একই বিষয় হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইতিমধ্যে এই লক্ষ্যে তারা অনেকটাই সফল হয়েছে। আর এটাকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণের একটা বড় উপলক্ষ মনে করেছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের ভাষায় কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ইতিমধ্যে ৮ মাস গড়ালেও এ নিয়ে কোনো ধরনের সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই যুদ্ধটি আদৌ দ্রুত শেষ হবে কিনা, সেটা নির্ভর করছে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের নিষ্পত্তির ওপর। আর এর মূলে আমাদের খুঁজতে হবে যুদ্ধের মূল কারণ। এই আলোচনায় আগে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসরায়েলের শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত এবং নির্বিঘ্ন রাখা। সুতরাং সেই লক্ষ্যে তাদের দরকার ইরানের শক্তিকে এমনভাবে ছেঁটে ফেলা, যেন তারা আর কখনো ইসরায়েলের শক্তির জন্য হুমকি হয়ে না ওঠে।
ট্রাম্পের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, তিনি আসলে ইরানের শক্তিকে সঠিকভাবে যাচাই করতে পারেননি, বরং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। গত বছর জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধে যখন যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে যুদ্ধ শুরু করে নিজ থেকেই ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনার ।এরপর এই আলোচনা চলমান থাকা অবস্থায় তারা আবারও যেভাবে নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, এটাই ট্রাম্পের জন্য একটা বিপর্যয় হিসেবে এখন দেখা হচ্ছে। ইরানের শক্তির জন্য এখন সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হচ্ছে ইয়েমেনের হুতিরা। হুতিদের মূল লক্ষ্য সৌদি আরব হলেও তারা জানে সৌদির ক্ষমতার উৎস যুক্তরাষ্ট্র। এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে হুতিদের সমঝোতা হলেও সৌদি আরবের উদ্দেশে তাদের বার্তা অনেক কঠোর। বাব এল মান্দেব প্রণালি বন্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি। সৌদির ওপর তাদের ক্ষোভের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, তারা ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং হুতি নিধন অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছে। সম্প্রতি পাকিস্তান এবং তুরস্কের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি নিয়ে এতদিন ধরে ধারণা করা হচ্ছিল যে, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হুমকি থেকে নিজেদের নিরাপত্তার তাগিদে সৌদি আরবের আগ্রহে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, এই চুক্তিকেই সৌদি আরব হুতি দমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চাইছে, যার মাধ্যমে পাকিস্তান ইতিমধ্যে কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সহায়ক হিসেবে, কয়েকটি বিমানবোঝাই করে অস্ত্র পাঠিয়েছে ইয়েমেনের সেনাদের সহায়তা করার জন্য, তুরস্কের পক্ষ থেকেও ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। এমন পরস্থিতিতে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও ট্রাম্প নতুন করে হুতিদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযানে আর জড়াতে চাইছেন না।
বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করে এটাই বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে এখন বেশ অসহায় অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অভিযানগুলোতে তাদের চিরচেনা মিত্র ইউরোপকে এবং জাপান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোকে তারা পাশে পেলেও ইরান যুদ্ধে কার্যত তাদের একাই লড়তে হচ্ছে। সেই সঙ্গে এই যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য থেকেও তিনি এখন অনেকটা দূরে অবস্থান করছেন। ২০১৫ সালে ছয় জাতির সঙ্গে ইরানের চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়াটা অপর পাঁচ জাতি যেমন সমর্থন করেননি এবং ইরান এমন কোনো কাজ করছে, যার কারণে সরে যাওয়া উচিত এমন গ্রহণযোগ্য অবস্থা সৃষ্টি না হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ যে তাদের আজকের অবস্থানকেই জানান দেওয়ার জন্য, সেই দায় আর কোনো দেশ এখন আর নিতে চাইছে না। সম্প্রতি ইরানের পক্ষ থেকে তাদের কয়েকটি দাবি, যেমন হরমুজ প্রণালি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত অর্থের ছাড় এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করলে ৭ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির আগ্রহের বিষয়টি নাকচ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় চালানটি নিঃশর্তভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সমর্পণ করে পরাজয় স্বীকার করে নিক। সেটা যে সম্ভব নয়, এ কথা ট্রাম্পকে কে বোঝাবে! তার মানে আরও দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে এই যুদ্ধ।
লেখক : কূটনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষক। অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
mfulka@yahoo.com