এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য

সিন্ডিকেটের বৃত্ত ভাঙতেই হবে

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৯ এএম

আমরা জানি, সিন্ডিকেট হলো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোনো গোষ্ঠীর এমন একটি স্ব-সংগঠিত জোট, যারা নিজেদের বিশেষ স্বার্থরক্ষা বা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র যেমন বাজার, ব্যবসা, প্রশাসন বা শিক্ষা ইত্যাদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে গোপনে বা প্রকাশ্যে প্রভাব বিস্তার করে। অপ্রিয় হলেও সত্য, এই অপকাণ্ডই ঘটে চলেছে আমাদের সমাজে। বিশেষ করে বাজার ফিরে ফিরে কীভাবে সিন্ডিকেটের মুঠোবন্দি হয়ে পড়ে এর বহু নজির আছে আমাদের সামনে। ১১ অক্টোবর দেশ রূপান্তরে ‘সব সিন্ডিকেট ঢাকায়’ শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদনে আবার সামনে এসেছে এই কুনজির। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভাগীয় শহর থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত দামের কাছাকাছি দামে এলপিজি বিক্রি হলেও ঢাকার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। খুচরা বিক্রেতারা দায় চাপাচ্ছেন ডিলারদের ওপর আর ডিলাররা দোষ দিচ্ছেন বিপণন কোম্পানিগুলোকে। এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে ভোক্তারা নাকাল। সম্প্রতি এলপিজির দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আকস্মিক দাম বৃদ্ধিতে ভোক্তার মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার ঘটে, একই সঙ্গে সৃষ্টি হয় চরম ভোগান্তিও। ঢাকায় সিন্ডিকেটের কারসাজি এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছে। তারা ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই ভোক্তাদের সবচেয়ে বেশি দামে এলপিজি কিনতে হয়। অভিযোগ আছে, প্রতি সিলিন্ডারে ৭০০ টাকারও বেশি নিচ্ছে ফন্দিবাজ বিক্রেতারা।

আমরা এলপিজির দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট অস্থিরতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শুনে আসছি। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আমদানিকারক মালিকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তরফে জানানো হয়েছে, বাড়তি দামে কেউ এলপিজি বিক্রি করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্য এলাকার ব্যবসায়ীরা বলেছেন, বিইআরসি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকায় তারা কোম্পানির কাছ থেকে এলপিজি কিনছেন, বাড়তি টাকা নিচ্ছে না। কিন্তু ঢাকার ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, কোম্পানিগুলোই বাড়তি দাম নিচ্ছে। এমন অভিযোগ তারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনেও (বিইআরসি) জমা দিয়েছেন। আমাদের দাবি, যত দ্রুত সম্ভব বিইআরসির বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ প্রতিবিধানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। বিইআরসির দায়িত্ব জনস্বার্থে চলমান তুঘলকিকা- বন্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া। সরকারের বাজার তদারকি সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোরও সমভাবেই তৎপর হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই নৈরাজ্য বন্ধ করতেই হবে। সিন্ডিকেটের গোড়ায় হাত দিতে হবে এবং যাতে ফের এর উৎপত্তি না হয় রুদ্ধ করতে হবে সেই পথও।

অসাধু ব্যবসায়ীরা যেকোনো পরিস্থিতিতে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরির জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে ইতিপূর্বে আমরা সরকারের তরফে বহু অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি শুনেছি বটে, কিন্তু কাজের কাজ কতটা কি হয়েছে তা অভিজ্ঞতায়  অপ্রীতিকর। দেশে বাজারব্যবস্থার প্রসঙ্গ উঠলেই আলোচনায় আসে সিন্ডিকেট শব্দটি। কিছুদিন পর পর কোনো না কোনো পণ্য সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ছেই। দাম বাড়ানোর পেছনে নানা ইস্যু-অজুহাত হিসেবে সামনে আনা হয়। সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কারণে এবং যথাযথ তদারকির অভাবে ঠকছেন ভোক্তা এই বাস্তবতা দায়িত্বশীল কোনো পক্ষেরই অজানা না থাকলেও দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিবিধানের বিষয়টি কার্যত প্রশ্নবোধক। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে ঢাকার এলাকাভিত্তিক ও ঢাকার বাইরে এলপিজি সিলিন্ডারের দামের ক্ষেত্রে যে চিত্র উঠে এসেছে তা এক কথায় ‘শুভংকরের ফাঁকি’ বৈ কিছু নয়। এলপিজি অর্থাৎ তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস সাধারণত গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয়। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, সবখানে রান্নার একমাত্র ভরসা এখন এলপিজি। সে হিসেবে রসুইখানায় আগুনের স্বাভাবিক উত্তাপের সঙ্গে জনজীবনে যে বাড়তি উত্তাপ ছড়িয়েছে এর নিরসন করতে হবে বাজার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে।

আমরা পরস্পরবিরোধী কোনো কথা শুনতে চাই না, আমরা চাই জনজীবনে স্বস্তি। স্কটিশ দার্শনিক ও আধুনিক অর্থনীতির জনক হিসেবে খ্যাত অ্যাডাম স্মিথ যথার্থই বলেছেন, ‘একই ব্যবসার মানুষেরা খুব কমই একসঙ্গে মিলিত হয়, এমনকি আনন্দ-ফুর্তির জন্যও নয়। তবে তারা যখনই মিলিত হয়, তখনই তাদের কথোপকথন সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র অথবা পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো চক্রান্তে রূপ নেয়। আমাদের সমাজে যেন এরই কদর্যতা দৃশ্যমান।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত