দুই বছরের কারাদণ্ড থেকে খালাস পেলেন স্বামী

ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে টাকা দাবি করলেই যৌতুক নয়: হাইকোর্ট

বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে নয়, বরং ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করলেই তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যৌতুক হিসেবে গণ্য হবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। সাত বছর আগে কক্সবাজারে স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগে দুই বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক ব্যক্তিকে খালাস দেওয়ার রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দেন উচ্চ আদালত।

খালাস পাওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. রাসেল উদ্দিন। অধস্তন আদালতের দেওয়া দুই বছরের কারাদণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁর করা আপিল মঞ্জুর করে সাজা বাতিল করেন হাইকোর্ট। গত ৩ আগস্ট বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। গতকাল রোববার ১২ পৃষ্ঠার রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

মামলার নথি ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাসেল উদ্দিনের সঙ্গে ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের বাইতুশ শরফ মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাসেল তাঁর ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। ইসমত আরা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে রাসেল কাঠের লাঠি দিয়ে তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করা হয়।

এ ঘটনায় ইসমত আরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌতুকের জন্য মারধরের অভিযোগে রাসেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন রাসেল।

আপিলের শুনানিতে মামলার নথি ও অধস্তন আদালতে উপস্থাপিত ছয় সাক্ষীর জবানবন্দি পর্যালোচনা করেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত বলেন, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২(ঞ) ধারা অনুযায়ী, বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে বর বা বরপক্ষের পক্ষ থেকে অর্থ বা সম্পত্তি দাবি করাকেই যৌতুক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

রায়ে আরও বলা হয়, নথিভুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়নে দেখা যায়, দণ্ডপ্রাপ্ত আপিলকারী তাঁর স্ত্রীর কাছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে এক লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার প্রাসঙ্গিক সময়ে ওই অর্থ যৌতুক হিসেবে দাবি করা হয়েছিল, তা প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে কথিত এক লাখ টাকা দাবিটি আইনের ২(ঞ) ধারায় বর্ণিত যৌতুকের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে না বলে আদালত অভিমত দেন।

মারধরের অভিযোগের বিষয়ে হাইকোর্ট বলেন, বাদী তাঁর জবানবন্দিতে লাঠির আঘাতে ডান কাঁধ ও পিঠে আঘাত পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, চিকিৎসকের সাক্ষ্য ও হাসপাতালের মেডিকেল সনদে আঘাতের স্থান হিসেবে বাম কাঁধের কথা বলা হয়েছে। আঘাতের স্থান নিয়ে বাদীর মৌখিক সাক্ষ্য ও চিকিৎসা নথির এই স্পষ্ট বৈপরীত্য শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুতর সন্দেহের মুখে ফেলে দেয়।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট মামলাটিকে ভিত্তিহীন ও সাজানো হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় ও দণ্ডাদেশ বাতিল করে রাসেল উদ্দিনকে খালাস দেন।

আদালতে আপিলকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আল রেজা মো. আমির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মনজুরুল আলম সুজন।