বিশ্ব শিক্ষক দিবস

বিদেশ বিভুঁইয়ে বাঙালি নস্টালজিয়া

দুপুরবেলা বিভাগের দরজার বাইরে বেঞ্চে বসে আছি। চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ, লুকোবার চেষ্টাও করিনি, করেই বা কী লাভ? ভিসার মেয়াদ আর বড়জোর দিন তিনেক। ঠিক এই সময়েই দিল্লির এফআরআরও অফিস থেকে মেইল এলো, ‘তিন দিনের মধ্যে সব কাগজ জমা না দিলে তোমার আবেদন বাতিল। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত দাখিল করো।’ সঙ্গে জরিমানার হুমকিও, কড়া ভাষায়।

স্কলারশিপের যে কটা পয়সা পাই, তাতে দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাত জোটে। বলে রাখা ভালো, দিল্লিতে ডাল-ভাত জোটানো রুটি-মাংসের চেয়েও কঠিন! জরিমানা হলে সেই দুই মুঠোও যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে শরীরটা এলিয়ে পড়েছে, টেরই পাইনি। এর আগেও দুটো নিয়েছিলাম, তাই অফিসের দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোক নতুন করে দিতে গড়িমসি করছিলেন। বললাম, আজ নতুন সার্টিফিকেট না পেলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে আমার। অনেক বোঝানো-সুঝানোর পর ভদ্রলোকের মনে বরফ গলল। শর্ত দিয়ে বললেন, বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। বিভাগীয় প্রধান সুবর্ণ চ্যাটার্জি মিটিংয়ে ব্যস্ত, আজ সই নাও হতে পারে। কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা। অফিস থেকে বেরিয়েও দরজার ঠিক সামনের বেঞ্চে ঠায় বসে। এমন সময় দেখি, মিটিং সেরে টিফিনবাটি হাতে বেরিয়ে আসছেন স্বয়ং অধ্যাপক সুবর্ণ চ্যাটার্জি, অক্সফোর্ডের ডক্টরেট। ফর্সা, ছিমছাম, লম্বাটে গড়ন। পরনে হাফহাতা সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট আর কালো জুতা; শার্টটা ইন করা। হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার জানালাম। তিনি হাসিমুখে জবাব দিলেন, বুঝে নিলেন, বাঙালি ছাত্র। বাংলা-ইংরেজি মিশিয়ে ঠা-া গলায়, ধীর মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লাঞ্চ করেছ?’ দিল্লির বুকে এমন বাংলা শুনে প্রথমে থতমত খেয়ে গেলাম। অপ্রস্তুত হয়ে কোনোমতে বললাম, ‘না স্যার। সার্টিফিকেট সই হয়ে গেলেই খেয়ে নেব।’ প্রশ্নটা শুনেই মনে হলো, শরীরের অর্ধেক ক্লান্তি আর মাথা থেকে অর্ধেক দুশ্চিন্তা নেমে গেছে। নিজের কামরায় ঢোকার সময় টেনে টেনে বললেন, ‘খেয়ে নিও, দেরি করো না। আমি অফিসেই আছি।’ মানে সই হয়ে যাবে, অত ভেবো না। এ তো বাঙালি পরিবারের সেই পুরনো রীতি; খাবারের সময় কেউ এলে তাকে না খাইয়ে ছাড়তে নেই। অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করে, বাংলা থেকে বহুদূরে বাস করেও সেই চিরচেনা সুর তিনি ভুলবেন কী করে? সে যা-ই হোক, জোর করে সঙ্গে বসাতে না পারলেও ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছেন ঠিকই। আচ্ছা, টিফিন বাটির ভাতের দিকে তাকিয়ে তিনি কী ভাবছিলেন? তার কি মনে পড়েছিল ছোটবেলার কোনো ভরদুপুরের স্মৃতি, মায়ের কথা? যেমন যা রান্না হয়েছে, তা-ই ভাগ করে খাওয়ার শিক্ষা। কে জানে। হয়তো বা!

শিক্ষার্থী, আইসিসিআর স্কলার, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়