চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি (জিইবি) বিভাগ। ক্যাম্পাসজুড়ে যখন নানা ঘটনার শোরগোল আর আলোচনা, তখন এই বিভাগের করিডর আর ল্যাবগুলোতে নীরবে বুনে যাওয়া হচ্ছে বৈশ্বিক স্বপ্নের বীজ। সেই স্বপ্নেরই বড় এক ফসল দেখা গেল গত দুবছরে। শুধু ইউরোপের বিভিন্ন দেশেই মর্যাদাপূর্ণ বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষায় পাড়ি জমিয়েছেন বিভাগটির অন্তত ১১ জন শিক্ষার্থী। আর সব মিলিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে স্কলারশিপ পেয়েছেন প্রায় ৩৫ জন।
বিভাগটির শিক্ষার্থীদের বৃত্তির এই ঝুলিতে জমা পড়েছে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, ইরাসমাস মুন্ডুস, সুইডিশ ইনস্টিটিউট স্কলারশিপের মতো বিশ্বের নামজাদা সব আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ। যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড কিংবা বেলজিয়াম; ইউরোপের শীর্ষ সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যানসার, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, মানব জিনোম, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, জনস্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ জেনেটিক্সের মতো জীবনরক্ষাকারী ও জটিল বিষয়গুলো নিয়ে এখন গবেষণা করছেন চবির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজির শিক্ষার্থীরা।
ইরাসমাস মুন্ডুস বৃত্তি নিয়ে ২০২৫ সালে সুইডেনে পাড়ি দেন আজিজুর রহমান রিয়াজ। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে একই ইউরোপীয় স্কলারশিপ নিয়ে জার্মানিতে গেছেন সিলভিয়া নাজনীন। ২০২৩ সালে একই স্কলারশিপ পান তৌসিফ রেজা। সুইডেনের ঐতিহ্যবাহী উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বৃত্তি নিয়ে গবেষণা করছেন সোনিয়া আহসান চৌধুরী।
কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে গেছেন রাহী হাসান চৌধুরী। এবং যুক্তরাজ্যে ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স এ মলিকুলার মেডিসিন নিয়ে পড়াশোনা করছেন নোমান পাটওয়ারী। যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছেন মাহিম চাকমা, যার কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা। অন্যদিকে মেডিকেল জেনেটিক্সে চবি থেকে এমফিল শেষ করে প্রাপ্ত গবেষণার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যের মাটিতে মানবদেহের জিনগত পরিবর্তন ও জিনোমিক্স নিয়ে উচ্চতর গবেষণা শুরু করেছেন চিকিৎসক শুভ দাশ।
বেলজিয়ামের নামকরা কেইউ লিউভেনে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা করছেন জামিল জুলফিকুল।
ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ জেনেটিক্স নিয়ে কাজ করছেন মিথুন দত্ত।
এ ছাড়াও জার্মানিতে মানবদেহের শারীরবৃত্তীয় ও জৈবিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়েছেন শফিকুল ইসলাম রাকিব ও সাদমান ইউসুফ সাজিদ।
সাফল্যের নেপথ্যে
শ্রেণিকক্ষ থেকে বৈশ্বিক ল্যাব
এই ধারাবাহিক ও অভাবনীয় সাফল্যের রহস্য কী? উত্তর মিলল শিক্ষার্থীদের কথাতেই। একটি সুনির্দিষ্ট একাডেমিক পরিবেশ, গবেষণার সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক মানসিকতা।
জিইবি বিভাগের প্রধান শক্তি তাদের ল্যাব ও গবেষণা। স্নাতকোত্তর কিংবা স্নাতক শেষ করার আগেই শিক্ষার্থীরা যুক্ত হচ্ছেন ক্যানসার, ডায়াবেটিস, অটিজম, সংক্রামক রোগ, জনস্বাস্থ্য ও উদ্ভিদের উন্নত জাত উদ্ভাবনের মতো বাস্তবভিত্তিক গবেষণা প্রকল্পে। বিদেশে পাড়ি দেওয়ার আগেই সিলভিয়া নাজনিনের তিনটি, আজিজুর রহমান ও সাদমান ইউসুফের দুটি, এবং রাহি হাসান চৌধুরীর তিনটিরও বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই অভিজ্ঞতাই বিশ্বমঞ্চে তাদের আবেদনকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে তোলে।
৬০ শতাংশ শিক্ষকই বিদেশফেরত
বিভাগের প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকই বিশ্বের বিভিন্ন নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষ করে এসেছেন। ফলে একজন শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বৈশ্বিক একাডেমিক পরিবেশের সংস্পর্শ পান। থিসিস সুপারভাইজার অধ্যাপক মুহাম্মদ আল ফোরকানের মতো শিক্ষকদের বিদেশের অভিজ্ঞতা ও নিরন্তর পরামর্শ রাহি হাসান চৌধুরীর মতো বহু শিক্ষার্থীকে কমনওয়েলথের মতো স্বপ্নের বৃত্তির পথ দেখিয়েছে। ড. লায়লা খালেদা খালেদা সহযোগিতা করেছেন আজিজুর রহমানের ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের আবেদনে।
তথ্যের সহজলভ্যতা ও সংগঠন
শিক্ষার্থীদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, ইউটিউবে স্কলারশিপ স্কুলের ভিডিও এবং ‘চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড হায়ার স্টাডিজ সোসাইটি’। প্ল্যাটফর্মটির ফেসবুক ও লিংকডইন পেজ থেকে নিয়মিত মিলছে আইএলটিএস-জিআরই প্রস্তুতি, এসওপি লেখার নিয়মাবলি ও স্কলারশিপের হালনাগাদ তথ্য।
ভাষা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম
প্রথম দিন থেকেই শ্রেণিকক্ষে ইংরেজিতে প্রেজেন্টেশন ও অ্যাকাডেমিক যোগাযোগের চর্চা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পাশাপাশি বিতর্ক, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজ বাড়িয়ে দেয় তাদের নেতৃত্বের সক্ষমতা।
শিক্ষার্থীদের এই সাফল্যে বেশ উচ্ছ্বসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আল ফোরকানও। তিনি নিজেও এই বিভাগের শিক্ষক। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, আমরা ছাত্রছাত্রীদের শুরু থেকেই টেককেয়ার করি। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার জন্য মোটিভেট করি। আমাদের শিক্ষকরাও এই বিষয়ে খুবই যতœবান। শত ব্যবস্ততার মাঝেও তারা শিক্ষার্থীদের লেটার অব রিকমেন্ডেশন দিয়ে থাকেন। আমি নিজেও উপাচার্যের দায়িত্ব পালনের ফাঁকেও দিচ্ছি।
আর আমাদের শিক্ষার্থীদের গবেষণার মান খুবই ভালো। তাদের গবেষণা ভালো ভালো জার্নালে প্রকাশিত হয়। এসব কারণে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব সহজেই তাদের গ্রহণ করে।