বইয়ের পাতা থেকে বাস্তবে

প্রতিদিনের ক্লাস, লেকচার, প্র্যাকটিক্যাল, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততায় কখন যে দিনগুলো একে একে পেরিয়ে যায়, তা টেরই পাওয়া যায় না। অথচ বিশ^বিদ্যালয় জীবন শুধু চার দেয়ালের শ্রেণিকক্ষ আর বইয়ের পাতায় আটকে থাকার নয়। কখনো কখনো একটু দূরে বেরিয়ে আসতে হয় চেনা ব্যস্ততা থেকে, নিয়মের গন্ডি থেকে। তেমনই এক দিনের গল্প জীবোন্মেষ ৬৩ ব্যাচের।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারাসাইটোলজি বিভাগের লেভেল-২, সেমিস্টার-২-এর প্রায় দুই শত শিক্ষার্থী, পাঁচজন শিক্ষক ও দুজন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টকে নিয়ে শুরু হয় আমাদের ডে ট্যুর। চারটি বাসে সকাল সাড়ে ৬টায় যখন যাত্রা শুরু হলো, তখন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল দিনটি অন্যরকম হতে চলেছে।

যাওয়ার পথে ঘুম যেন কারও চোখেই ছিল না। ফিরতি পথে অবশ্য সারা দিনের ক্লান্তিতে অনেকের চোখে নেমে এসেছিল ঘুমের রাজ্য।

তবে এই ভ্রমণ শুধু আনন্দের ছিল না; ছিল শেখারও। সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামার পরিদর্শনের পাশাপাশি পোলট্রি ও ডেইরি খামার ঘুরে দেখা হয়। পরজীবী সংক্রমণ হলে কীভাবে তা শনাক্ত করা যায়, কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের ওষুধ ও চিকিৎসা প্রয়োজন এসব বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ হয়। বইয়ের পাতায় পড়া বিষয়গুলো যখন চোখের সামনে বাস্তব হয়ে ধরা দেয়, তখন শেখাটাও যেন একটু বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে।

দিনের বাকি অংশ কাটল যমুনার পাড়ে।

নৌকায় উঠতেই চারপাশ বদলে গেল। যমুনার শান্ত জল, নদীর বুক ছুঁয়ে আসা ঠা-া বাতাস আর দূরের দিগন্তে আকাশ-নদীর মিলেমিশে যাওয়া দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন এক বিশাল ক্যানভাস মেলে দিয়েছে। নদীর পাড়ে হাঁটা, নৌভ্রমণ, চায়নাবাঁধের কাশবনে ঘোরাঘুরি আর অগণিত ছবি- সবকিছু মিলিয়ে সময়টা কখন যে ফুরিয়ে গেল, বোঝাই গেল না।

এই দিনের আরেকটি সুন্দর প্রাপ্তি ছিল শিক্ষকদের নতুন করে দেখা। শ্রেণিকক্ষের গাম্ভীর্যের বাইরে তাদের আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, বারবার আমাদের খোঁজ নেওয়া আমরা স্বস্তিতে আছি কিনা, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা, খাবার ঠিক আছে কিনা সবকিছুতেই ছিল আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা। এক দিনের জন্য ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততা থেকে দূরে গিয়ে জীবোন্মেষ ৬৩ ব্যাচ যেন নিজেদেরই আরেকটি রূপকে আবিষ্কার করেছিল। কেউ নেচেছে, কেউ গান গেয়েছে, কেউ নদীর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে, কেউ শুধু বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করেছে।

দিন শেষে চারটি বাস ফিরে এসেছে বাকৃবির চেনা পথে। আবার শুরু হবে ক্লাস, প্র্যাকটিক্যাল, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততা। কিন্তু যমুনার সেই শান্ত জল, কাশবনের হাওয়া, বাসভর্তি হাসি আর একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো থেকে যাবে আমাদের সঙ্গে।

কারণ কিছু ভ্রমণ গন্তব্যে গিয়ে শেষ হয় না, ফিরে আসার পরও তারা মনের ভেতর নীরবে পথ চলতে থাকে।

শিক্ষাথী, দ্বিতীয় বর্ষ, ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ