লাল ও সাদা শাপলার হাসিতে মোহনীয় রূপ নিয়েছে গ্রামীণ খাল-বিল

প্রকৃতির এক অপরূপ বৈচিত্র্য নিয়ে গ্রামীণ জনপদের খাল-বিল আর জলাশয়গুলোতে এখন ফুটে আছে লাল ও সাদা শাপলা। ভোরের প্রথম আলোয় চারপাশ যখন কুয়াশায় ঢাকা, ঠিক তখন জলাশয়জুড়ে ডানা মেলে হাসছে এই দেশীয় ফুলগুলো। শাপলার এই সমারোহ দেখতে ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা উপভোগ করতে প্রতিদিনই বিলপারে ভিড় জমান প্রকৃতিপ্রেমী ও পথচারীরা।

কার্তিক-অগ্রহায়ণের এই সময়ে স্থানীয় প্রকৃতিতে এক অন্যরকম আভিজাত্য এনে দেয় এই শাপলা। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নিভৃত পল্লীর অবহেলিত জলাশয়, ডোবা ও বিলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় এই শাপলা। সকালে যখন চারপাশ রোদে ঝলমল করে ওঠে, তখন সবুজ পাতার বিছানায় লাল ও সাদার মিতালি এক চমৎকার দৃশ্যের অবতারণা করে।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষার পানি আসার সঙ্গে সঙ্গেই বিলে শাপলার প্রস্ফুটন শুরু হয়। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলো তাদের পাপড়ি মেলে ধরে এবং দুপুরের দিকে রোদ বাড়লে তা আবার বুজে যায়। এই রোদ-ছায়ার লুকোচুরি খেলা মুগ্ধ করে সবাইকে।

বিলে ফুটে আছে বেগুনী শাপলা

শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি দেশের জাতীয় ফুল। তাছাড়া শাপলা একটি আদর্শ সবজি। তবে দুঃখের বিষয়, জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মৎস্যচাষ এবং জলজ পরিবেশ ধ্বংসের কারণে প্রাকৃতিকভাবে শাপলা জন্মানোর ক্ষেত্রগুলো দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখতে এসব জলাশয় ও শাপলা ফুল সংরক্ষণ করা জরুরি বলে মনে করেন পরিবেশবাদীরা।

সরেজমিনে সুজানগর গাজনার বিল, চাটমোহর ডিকশির বিল, চলনবিল, পাবনা শহরসহ গ্রামের ছোট ছোট পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে গিয়ে দেখা যায়, শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে লাল ও সাদা শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যের মনোরম দৃশ্য। দেখে মনে হবে শরতের শেষেও এখনো বর্ষার স্নিগ্ধতার রেশ রয়েছে প্রকৃতিতে। নীরবে-নিভৃতে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে বিলের পানিতে ফুটে থাকা লাল ও সাদা শাপলা। দেখে মনে হবে প্রকৃতি যেন সেজেছে লাল ও সাদা রঙের অনন্য সাজে। অনেকে আবার লাল শাপলাকে রক্তকমল নামেও ডেকে থাকে।

সুজানগর এলাকার বাসিন্দা সালমান জানান, আগে গাজনার বিলসহ বিভিন্ন বিল-ঝিলে প্রচুর পরিমাণে শাপলা ফুল দেখা যেত। তবে বিলে আগের মতো পানি না আসা ও জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার করাসহ শাপলার মূল তুলে ফেলায় আগের মতো আর বিলে শাপলা ফুল ফুটতে দেখা যায় না।

গ্রামীণ জলাশয় থেকে শাপলা ফুল সংগ্রহ করেছে শিশুরা।

ভাঙ্গুড়া এলাকার বাসিন্দা মাসুম জানান, শাপলার ডাঁটা সবজি হিসেবে খুব ভালো। তিনি জানান, আগে গ্রামীণ নারীরা শাপলার ঢ্যাপ থেকে দানা বা বীজ বের করে রোদে শুকিয়ে তা দিয়ে খই ভাজত। এছাড়াও গ্রামের দরিদ্র ব্যক্তিরা ভাতের চালের বিকল্প হিসেবে শাপলার ঢ্যাপ দিয়ে ভাত রান্না করে খেত।

পাবনা সদর পৈলানপুর এলাকার বাসিন্দা সোহান হোসেন জানান, গ্রামে শাপলা ফুল দেখা গেলেও শহরে তেমন একটা চোখে পড়ে না। তবে তাদের এলাকার পরিত্যক্ত ডোবাগুলোতে লাল শাপলার দেখা মেলে বলে জানান তিনি।

পাবনা সদর রাজাপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল হোসেন বলেন, শাপলার কেবল সৌন্দর্যই নয়, লাল ও সাদা শাপলা প্রান্তিক মানুষের জীবিকার উৎস। বর্ষার এই সময়টাতে অনেকে বিল থেকে শাপলা ও শালুক আহরণ করে হাটবাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।

চাটমোহর এনায়েতুল্লাহ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, শাপলা মূলত নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে বেশি জন্মায়। জলাশয়ের এই ফুলকে কেন্দ্র করে জলজ প্রাণী, পোকামাকড়, ব্যাঙ, মাছ ও পাখিরা নির্ভরশীল, যা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। লাল শাপলা জলাশয়ের পানিকে পরিষ্কার রাখতে এবং পানিতে অক্সিজেনের সরবরাহ বৃদ্ধি করে বলে জানান তিনি।