তিন মাসে সাংবাদিক নিপীড়নের ৩৯ , কিউআরএস টিমের উদ্বেগ

বাংলাদেশে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ওপর অব্যাহত হুমকিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কুইক রেসপন্স সাপোর্ট (কিউআরএস) টিম। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস)-এর সহায়তায়, অ্যাডভোকেসি সংস্থা 'ভয়েস', ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতার ১৩৩টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যা প্রতি তিন মাস পরপর প্রকাশিত হচ্ছে। সর্বশেষ তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মোট ৩৯টি ঘটনা ঘটেছে। কিউআরএস টিম সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা জোরদার করা, নিয়ম লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ঘটনা প্রতিরোধ ও সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য পাওয়ার অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

গত তিন মাসে কিউআরএস টিম লক্ষ্য করেছে যে সেন্সরশিপ কেবল ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদেরই নয়, গণমাধ্যমগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংক্রান্ত একটি সংবাদ প্রতিবেদন সাইবার হামলার মাধ্যমে চ্যানেল ওয়ানের ওয়েবসাইট থেকে কর্তৃপক্ষের অবগতি ছাড়া সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে জানা গেছে। তা ছাড়া, একই চ্যানেলের সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পাশাপাশি, একটি ইসলামিক বইমেলায়, চিহ্নিত চরমপন্থী নেতাদের রচিত বইয়ের প্রকাশ্য বিক্রির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনলাইন পোর্টাল 'ঢাকা স্ট্রিম' সাইবার হুমকির মুখে পড়েছে। এই ধরনের ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি করে এবং ভয় ও বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের সংবাদ পরিবেশন করার ক্ষমতার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।

দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। স্টার টিভির কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি মোহাম্মদ জুবায়ের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের একটি অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহ করার সময় স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। একইভাবে, দ্য ডেইলি স্টারের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি ওমর আলী সোহাগ আইনমন্ত্রীর একটি অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করার সময় ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের দ্বারা হামলার শিকার হন। অপর এক ঘটনায়, ঢাকার বিজয় সরণিতে এক নারীকে পুলিশ লাঞ্ছিত করার দৃশ্য ধারণ করার সময়, গ্লোবাল টিভির সাংবাদিক বুলবুল হোসেনকে পুলিশের গাড়িতে তুলে পেটানো হয়। দায়িত্ব পালনকালে হামলার ঘটনা সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে এবং বাধাহীনভাবে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাওয়া বা ন্যায়বিচার চাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে; বিশেষ করে যখন অপরাধীরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়, তখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকে।

ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর থেকে অবৈধভাবে প্রাকৃতিক পাথর উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর কালের কণ্ঠের হবিগঞ্জ প্রতিনিধি কবির আহমেদ লাঞ্ছিত ও আহত হয়েছেন। একইভাবে, একটি কথিত মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশের পর মোহনা টিভির মীরসরাই প্রতিনিধি কামরুল ইসলামকে মারাত্মকভাবে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে বলে জানা যায়। এই ধরনের ঘটনা অনুসন্ধানমূলক এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা সাংবাদিকদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে এবং অনুসন্ধানমূলক সংবাদ প্রচার করার ক্ষমতাকে সীমিত করে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সংবাদ পরিবেশনের জেরে সাংবাদিকরা হত্যাচেষ্টার শিকার হচ্ছেন, যা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে। খুলনায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ওপর খবর প্রকাশের পর একদল সাংবাদিককে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। অপরদিকে, কিশোর অপরাধীদের নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করার পর, বাংলা টিভির সাংবাদিক প্রান্ত পারভেজকে তাঁর নিজের বাড়িতে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়। এই ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের জন্য চরম হুমকি তৈরি করে এবং জননিরাপত্তা ও সুরক্ষার সাথে সম্পর্কিত সাহসী প্রতিবেদন তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করে, যা সার্বিকভাবে মুক্ত সাংবাদিকতার চর্চাকে ক্ষুণ্ণ করে।

কিউআরএস টিম সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর সময়োপযোগী, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করার, অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর উচিত সাংবাদিকদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তাদের পেশাগত দায়িত্বে বাধা সৃষ্টি করা কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মুক্ত গণমাধ্যম এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। সেজন্য বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য একটি নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য পূরণে সরকার, গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের যৌথ ও গঠনমূলক সহযোগিতা করার জন্য কিউআরএস টিম অঙ্গীকারবদ্ধ।