ট্রাম্পের ঘোষণায় বিস্মিত জেলেনস্কি

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সম্মতিতে একটি জ্বালানি যুদ্ধবিরতির খবর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজ সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত রবিবার ট্রাম্প লেখেন, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের চুক্তি এখনই কার্যকর হচ্ছে। দুই পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। কেউ এটি ভাঙবে না।’ তবে আশ্চর্যের বিষয় হলোÑ ট্রাম্প ঘোষিত এই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কিছুই জানেন না ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, যুদ্ধবিরতির কথা তিনি প্রথম শুনলেন। চুক্তির বিস্তারিত জানতে তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ও ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাবের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাশিয়া প্রস্তুত থাকলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় স্পষ্ট রূপরেখা পাওয়া গেলে ইউক্রেনও হামলা বন্ধ করতে রাজি বলে ভাষ্য জেলেনস্কির। তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ দিয়ে আসছিলেন ট্রাম্প। গত শনিবার তিনি জেলেনস্কিকে হামলা বন্ধ করার জন্য কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। একইসঙ্গে ইউক্রেনে নতুন নির্বাচন দিয়ে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহ্বান জানান। ট্রাম্পের অভিযোগ, রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারেননি জেলেনস্কি। তবে ট্রাম্প নতুন এই জ্বালানি যুদ্ধবিরতির বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। ট্রাম্পের ওই বার্তার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভের একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় রাশিয়া। তাতে অনেক এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে বিবিসি। জেলেনস্কি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জ্বালানি যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরই আমাদের বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া।’

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির রেকর্ড দাম কমানোর অংশ হিসেবে সম্প্রতি রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নিয়ে ডিজেল আমদানির চুক্তি করেছেন ট্রাম্প। এরপর থেকে তিনি ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধের তাগিদ দিয়ে আসছেন। তবে ট্রাম্পের এই ডিজেল চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে এটিকে পুতিনের জন্য ‘উপহার’ বলেছেন জেলেনস্কি। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নাম, ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই ‘জ্বালানি যুদ্ধবিরতি’র আহ্বানকে সমর্থন করলেও, ডিজেল চুক্তির বিরোধিতা করেছে। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি-বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা এই চুক্তি সমর্থন করেন না। যুক্তরাষ্ট্রেও বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ৩ জন ডেমোক্র্যাট ও ৪ জন রিপাবলিকান সিনেটর এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ট্রাম্পের চুক্তি কংগ্রেসের পাস করা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, যেখানে রাশিয়ার ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ছিল।

এদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে গভীর অভ্যন্তরে হামলা বন্ধ না করলে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর মাধ্যমে মার্কিন অস্ত্র কেনা স্থগিত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। দুই ইউরোপীয় কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও পেন্টাগন থেকে ইউক্রেন ও ইউরোপের কর্মকর্তাদের কাছে এই সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী সরাসরি ইউক্রেনীয় কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এই বার্তা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’ প্রথম এই গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অস্ত্র ক্রয় বন্ধের হুমকির খবর প্রকাশ করেছিল।

রুশ হামলায় ইউক্রেনে ৬ জন নিহত : রবিবার রুশ হামলায় ইউক্রেনের দুটি শহরে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর খারকিভে তিনজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ। তার অনলাইনে পোস্ট করা ছবিতে দেখা গেছে, মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও পুড়ে যাওয়া যানবাহনের আশপাশে জরুরি উদ্ধারকর্মীরা কাজ করছেন। পশ্চিম ইউক্রেনে পৃথক এক হামলায় আরও তিনজন নিহত হয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানান।