ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তপ্ত হয়ে আছে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লি। ভোটার তালিকা সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগে বিরোধী জোট ও সিজেপির বিক্ষোভ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এই বিক্ষোভ ঘিরে রাজধানীর যন্তর মন্তর চত্বরে পুলিশের দমন-পীড়ন ও নির্বিচার আটকের ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা হচ্ছে। এর মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে কেরালার বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিধানসভায় গতকাল সোমবার এই প্রস্তাব পেশ করেন রাজ্যটির মুখ্যমন্ত্রী ভিডি সতীশন। শাসক দল কংগ্রেস তো বটেই, বিরোধী বাম বিধায়করাও এই প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন। সব মিলিয়ে চলমান এই আন্দোলন ক্রমেই জ্ঞানেশ কুমারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ভারতে প্রায় ১০০ কোটি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, সংশোধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে। কেরালার বিধানসভায় পাস হওয়া প্রস্তাবে তিনটি দাবির কথা বলা হয়েছে। এক. দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ। এই বিষয়ে আর্জি জানানো হবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। দুই. এসআইআর প্রক্রিয়ায় যেসব বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, তাদের নাম পুনরায় ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা এবং এসআইআর প্রক্রিয়ার ‘ভুলত্রুটি’ সংশোধন করা। তিন. মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন পুনরায় বদল করা। নিয়োগ সংক্রান্ত প্যানেলে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে রাখা।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে এই আইনে বদল এনে নিয়োগ প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এই প্যানেলে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানানো হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ক্ষমতাসীন সরকারের মতই এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাচ্ছে। ১৪০ আসনের কেরালার বিধানসভায় কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন শাসকজোট ইউডিএফ-এর ১০২ জন বিধায়ক রয়েছেন। বিরোধী বামজোট এলডিএফের বিধায়কসংখ্যা ৩৫। আর বিজেপির তিনজন বিধায়ক রয়েছেন। এই প্রস্তাব বিরোধী বামরাও সমর্থন করেন। সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, জ্ঞানেশকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে বিজেপির জন্য এক ধরনের ‘উভয়সংকট’ হিসেবে দেখছে। বিশ্লেষক ভার্গিস কে জর্জের মতে, জ্ঞানেশকে দায়িত্বে রাখা কিংবা তার বিদায়Ñ দুই ক্ষেত্রেই বিজেপির জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি রয়েছে। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সরকার সরাসরি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বরখাস্ত করতে পারে না। তাকে অপসারণের জন্য সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বিরোধীদের সঙ্গে জ্ঞানেশের সম্পর্ক তার মেয়াদের শুরু থেকেই টানাপড়েনপূর্ণ। এ বছর তাকে অপসারণের দাবিতে সংসদে একটি প্রস্তাবও আনা হয়েছিল। তবে সেটি গৃহীত হয়নি। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বাস্তবতায় জ্ঞানেশের থাকা বা সরে যাওয়াÑ দুটিই ক্ষমতাসীন বিজেপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।