মায়েদের সঙ্গে কারাগারে ৩০৩ শিশু

দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে ৩০৩ শিশু রয়েছে (গত ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত)। এ তথ্য জানিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর বলছে, এসব শিশুর প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিতে নিয়মিত খেলনা, পোশাক ও পুষ্টিকর শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে, কারাগারের পরিবেশ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে অনুকূল নয় । এ লক্ষ্যে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

গত ৮ মে দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। গত ১৬ জুন বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেয়। আদেশে দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারগুলোয় কারাবন্দি মায়েদের সঙ্গে বর্তমানে কত শিশু রয়েছে, তাদের বয়সসহ সার্বিক বিষয় জানাতে নির্দেশ দেয় উচ্চ আদালত। পাশাপাশি কারাগারে মায়েদের সঙ্গে থাকা শিশুদের প্রয়োজনীয় কল্যাণ, নিরাপত্তা, বিকাশ এবং জীবনমান উন্নয়নের ব্যবস্থা নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে রুল দেয় হাইকোর্ট।

রিটকারী আইনজীবীর উকিল নোটিস ও হাইকোর্টের নির্দেশনার পর সম্প্রতি এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রতিবেদনের অনুলিপি পাওয়ার বিষয়টি গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন রিটকারী আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা। তিনি জানান, রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিবেদন ও রুলের জবাব-সাপেক্ষে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপনের পর শুনানি হবে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ কারাবিধির (বাংলাদেশ জেল কোড) ৯৫৭ বিধি অনুযায়ী, নারী হাজতি ও কয়েদিরা চার বছর পর্যন্ত তাদের সন্তানদের কাছে রাখতে পারেন। তবে, আইনে বলা আছে, কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ছয় বছর পর্যন্ত সন্তানদের কাছে রাখা যাবে। কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শিশুর বয়স ছয় বছর পার হলে এবং মা কারাগারে থাকলে যে শিশুর স্বজনরা তাদের নিতে চান তাদের কাছে দেওয়া হয়। আর যেসব শিশুর স্বজন থাকে না তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাঠানো হয় সরকারি শিশুনিবাসে।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে ২৯৯ শিশু (২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) রয়েছে মায়েদের সঙ্গে। এর মধ্যে কন্যাশিশু ১৫৩ জন এবং ছেলে শিশু ১৪৬ জন। এসব শিশুর মায়েদের বেশিরভাগ মাদক মামলার আসামি। এই শিশুদের মায়েরা কেউ সাজা খাটছেন, কারও মামলা রয়েছে বিচারের পর্যায়ে। এ শিশুদের প্রায় সবাইকে থাকতে হয় কারাগারের নির্দিষ্ট ওয়ার্ড বা সেলে, যেখানে হত্যা ও মাদক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বা হাজতিরা থাকেন।

হাইকোর্টের উদ্দেশে সমাজসেবা অধিপ্তরের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশু আইন, ২০১৩-এর মূল দর্শন হলো ‘শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ’ রক্ষা করা। এই আইনের ৮৯ (১)(ঙ) অনুযায়ী, ‘কারাভোগরত মাতা-পিতার ওপর নির্ভরশীল বা কারাভোগরত মাতার সহিত কারাগারে অবস্থানরত শিশু’ সুবিধাবঞ্চিত শিশু হিসেবে গণ্য। ফলে কারাগারে এসব শিশুর ক্ষেত্রে অবেহলা বা অরক্ষিত অবস্থা পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থা গ্রহণ করা সমাজসেবা অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্ব।

মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাতে অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু অবস্থান করছে। প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’র মাধ্যমে কারাগারে আটক মায়েদের সঙ্গে অবস্থানরত এসব শিশুর প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত খেলনা, পোশাক এবং পুষ্টিকর শিশুখাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। আর এ কার্যক্রম সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান এবং সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিবর্গের দানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরাসরি শিশু সুরক্ষা ইউনিটের আওতায় কারাগারে কোনো কার্যক্রম না থাকলেও প্রবেশন শাখার মাধ্যমে শিশুদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

অধিদপ্তর প্রতিবেদনে বলেছে, কারাগারের পরিবেশ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অনুকূল নয়। তাই কারাগারে অবস্থানরত শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সর্বোত্তম স্বার্থরক্ষায় অধিদপ্তর কিছু সুপারিশ করেছে।

ক. ফস্টার কেয়ার বা বিকল্প পারিবারিক যত্ন-নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা শেষে কারাবন্দি মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুকে তার সর্বোত্তম স্বার্থে নিকটাত্মীয়ের কাছে ‘ফস্টার কেয়ার’র আওতায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে খ. সরকারি শিশু পরিবারের আবাসনকোনো শিশুর ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকলে বা তা শিশুর জন্য নিরাপদ না হলে, ওই শিশুর জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি শিশু পরিবার বা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে রেখে তার সার্বিক লালন-পালন ও শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ (গত ১৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া অবকাশ শেষ হবে আগামী ২৪ অক্টোবর) শেষ হলে জনগুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় বিষয়টি হাইকোর্টে উপস্থাপন করে দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’