কাকসায়েরের গল্প

এক বছর আগের ঘটনা। কাজের ব্যস্ততায় বিকেলে ক্যাম্পাস থেকে ঢাকায় না ফিরে কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে রয়ে গেলাম। সারা রাত কাজের পর ঘুমুতে যেতে দেরি হয়ে গেল। তবে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলো না। সকাল সাড়ে ৯টায় ক্লাস। ৯টার মধ্যে নাশতা সারতে হবে। তাই ক্লাসের আগে ঘণ্টা দুয়েক ক্যামেরা হাতে ক্যাম্পাসটা ঘুরে দেখলে মন্দ হয় না। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়। পরিযায়ী পাখিদেরও আনাগোনা শুরু হয়েছে। অতএব কিছু পাখি অন্তত পাওয়া যাবে। বিভাগ থেকে বেরিয়ে প্রথমেই দেখা হয়ে গেল তিলা ঘুঘুর সঙ্গে। ওর ছবি তুলে খানিকটা সামনে এগিয়ে বন ও পরিবেশ অনুষদের আমলকী বাগানের সামনে যেতেই পাখির কলকাকলি শোনা গেল।

আরেকটু সামনে এগোতেই আমলকী গাছের মরা ডালে টকটকে লাল চোখের কুচকুচে কালো একটি পাখিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখলাম। ত্রিশ সেকে-ের মধ্যে প্রায় একই আকারের লাল চোখের আরেকটি পাখি ওর কাছাকাছি এসে বসল। তবে ওর দেহের পালক কালো নয় বরং খানিকটা খয়েরি-বাদামি, তার ওপর অসংখ্য সাদা সাদা ছিট ও দাগ। কালোটি পুরুষ ও খয়েরি-বাদামির ওপর সাদা ছিটছোপের পাখিটি স্ত্রী। দ্রুত ওদের ছবি তুললাম। একটু ভালোভাবে লক্ষ করতেই দেখলাম দুটি পাখিরই ঠোঁটের আশপাশের পালক অবিন্যস্ত ও ভেঁজা। মুখ-ঠোঁটে খানিকটা লালচে রঙ যেন লেগে আছে। আমলকী বাগানের নিচেই ড্রাগন গাছ। মূলত গবেষণার জন্যই এগুলো লাগানো হয়েছে। গাছে প্রচুর ফল। বেশিরভাগই কাঁচা। তবে বেশকিছু টকটকে লাল ফলও রয়েছে।

এই ফলগুলো বেশ সুস্বাদু, বার কয়েক খাওয়ার সুযোগ হয়েছে। ড্রাগনের টকটকে লাল ফলের দিকে তাকিয়ে যখন এই কথাগুলো চিন্তা করছিলাম ঠিক তখনই স্ত্রী পাখিটি আমলকীর মরা ডাল থেকে নেমে এসে ড্রাগন গাছের ওপর বসল। এরপর ধীরে-সুস্থে বেশ আয়েশ করে টকটকে লাল ড্রাগল ফলে ঠোঁট চালাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো ফলটি খেয়ে লাফ দিয়ে আরেকটি ফলের কাছে গিয়ে বসল। আমিও বসে থাকলাম না। দ্রুত ছবি তুললাম ও ভিডিও করলাম। এরপর সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম অন্য পাখির খোঁজে।

আমলকী বাগানে ড্রাগন ফল খেতে দেখা পাখিগুলো আর কেউ নয় এদেশের অতি পরিচিত ও সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি কোকিল। কুলি বা এশীয় কোকিল নামেও পরিচিত। কক্সবাজারের দরিয়ানগরের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা পাখিটিকে ‘কাকসায়ের’ নামে চিনে। ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সস বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিয়ানগরস্থ ‘কোস্টাল বায়োডাইভারসিটি, মেরিন ফিশারিজ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সেন্টার’-এ চতুর্থ বর্ষ প্রাণিচিকিৎসার ছাত্রদের মাঠপর্যায়ে বন্যপ্রাণী চেনানোর ক্লাস নিতে গিয়ে অন্য বন্যপ্রাণীর সঙ্গে কোকিলের ছবিও তুলেছিলাম। তখন ওখানে উপস্থিত ছেলে-বুড়ো সবাই একবাক্যে বলেছিল যে পাখিটির নাম কাকসায়ের। পাখিটিকে এ নামে ডাকার কারণ জিজ্ঞেস করতেই এক বৃদ্ধ বললেন ‘ওরা দেখতে কাকের মতো কালো আর গান গায় সুন্দর।’ তাই এই নাম। যুক্তিটি অদ্ভুত হলেও সঠিক বলেই মনে হলো। যা হোক, কোকিলের ইংরেজি নাম Asian/Western Koel বা Asian Cuckoo। বৈজ্ঞানিক নাম Eudynamys scolopacea। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং অস্ট্রেলিয়ার আবাসিক পাখি এটি।

প্রাপ্তবয়স্ক কোকিল লম্বায় ৪০-৪৩ সেন্টিমিটার ও ওজনে ১৯০-৩২৭ গ্রাম। আগেই বলেছি স্ত্রী ও পুরুষ কোকিলের পালকের রঙে বেশ পার্থক্য রয়েছে। পুরুষের পালক কুচকুচে কালো ও তাতে সবুজাভ আভা। অন্যদিকে, স্ত্রীর খয়েরি-বাদামি দেহে অসংখ্য সাদা ছিট ও রেখা আঁকা। পুরুষের ঠোঁটটি চকচকে সবুজ হলেও স্ত্রীরটি হালকা ধূসর। চোখের রঙ টকটকে লাল। পা, পায়ের পাতা, আঙুল ও নখ কালো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে মায়ের মতো।

বাংলাদেশের সবখানেই কোকিলের দেখা মেলে। ওরা মূলত একাকী থাকে। প্রজননকাল ছাড়া সচরাচর জোড়ায় দেখা যায় না। ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের পাকা ফল খেতে পছন্দ করে। গাছের ছায়ার পাতার আড়ালে-আবডালে থাকতেই পছন্দ করে। পুরুষটি মধুর কণ্ঠে ‘কু-কুউ-কুউ-কুউউ-কুউউ-কুহু-কুহু ---’ স্বরে গান গাইলেও স্ত্রী কিন্তু নীরব।

মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। বাসা না বানানো অন্য কোকিলের মতো একইভাবে ওরা প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি করে। স্ত্রী কোকিল কাক, হাঁড়িচাচা বা ভাত শালিকের বাসায় দুই থেকে তিনটি নীলচে রঙের ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১২-১৩ দিনে। ছানারা ১৮-২০ দিনে বড় হয় ও উড়তে শিখে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ