বিশ্বায়ন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা ও যথোপযুক্ত দক্ষতা। যা নিশ্চিত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে পৌনে দুইশ। এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৬৪টি (৩টি আন্তর্জাতিক) ও ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের ভৌগোলিক আয়তন, শিক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা, মানবসম্পদের বর্তমান অবস্থা এবং বৈশ্বিক, জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা শুধু যথেষ্টই নয়, বরং অনেকাংশে বেশি বলেও বিবেচিত হতে পারে।
তবে প্রশ্নটা থেকে যায় এদের মধ্যে মানসম্পন্ন শিক্ষা ও গবেষণায় কতটির সক্ষমতা রয়েছে। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আরও কিছু হচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতায়, আর কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদান করে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাজ্ঞ ও যোগ্য গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত টিচিং ইউনিভার্সিটির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হয় প্রায় ৯শ কলেজে। দেশে এমন অনেক কলেজ রয়েছে, যেখানে অনার্স ও মাস্টার্স প্রোগ্রামের আসন সংখ্যা অনেক পাবলিক অথবা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যার চেয়ে বেশি। দুই যুগ আগেও রাজধানী ও বিভাগীয় জেলাগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান থাকলেও বর্তমানে দেশজুড়ে পাবলিক এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী ও উপযোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে কয়েকগুণ। তা সত্ত্বেও প্রতি বছরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজগুলোয় অনেক আসন খালি থাকে। যা অনেকটা সিস্টেম লসের মতো। ১১৭টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কয়েকটিতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করলেও কোনো কোনোটি আবার কাক্সিক্ষত শিক্ষার্থী পাচ্ছে না।
বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষা ও গবেষণার জন্য আসতেন। বর্তমানে এ সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলোয় প্রতি বছর ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে পড়তে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালে যার সংখ্যা ছিল ৫২ হাজার ৭৯৯। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব শিক্ষার্থী ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিশোধ করেছেন। এ ধারা ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ কোটি ৭ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৬১ লাখ, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ, ২০২০-২১ অর্থবছরে ২৪ কোটি ৩১ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ কোটি ৪৫ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮ লাখ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার এদেশ থেকে বৈধ চ্যানেলে বিদেশ গেছে টিউশন ফি পরিশোধে। এভাবে গত ৯ বছরে প্রায় ৩১১ কোটি ডলার বা ৩০ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এ দেশ থেকে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় টিউশন ফি বাবদ প্রেরণ করা হয়েছে। এর বাইরে অনেকে অর্থ প্রেরণে বিকল্প পন্থা অবলম্বন করেন। যা এ হিসাবে আসেনি। ২০২৪ সালে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন তথা কর্মসংস্থানে বৈষম্য দূরীকরণের আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তথা ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার টিউশন ফি ও অন্যান্য শিক্ষা ব্যয় বাবদ রেকর্ড ৬৬৭.৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮২,০৮৯ কোটি টাকার সমান) বিদেশে প্রেরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এটি দেশের ইতিহাসে একক কোনো অর্থবছরে উচ্চশিক্ষা খাতে বিদেশযাত্রার পেছনে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড। বিগত ৪ বছরে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাবদ অর্থ প্রেরণ বেড়েছে ১৫৩ শতাংশ। এই বিপুল অর্থপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এমনকি সীমাবদ্ধতা রয়েছে যে, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে? বিশ্বায়নের যুগে মেধাবীরা সারা বিশে^ লেখাপড়া করবেন, ক্যারিয়ার গড়বেন, বৈশ্বিক নাগরিক হবেন, এটাই স্বাভাবিক। একটা সময় ছিল আমাদের দেশ থেকে উচ্চতর মাস্টার্স বা পিএইচডি করতে শিক্ষার্থীরা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেতেন। হাতে গোনা কিছু শিক্ষার্থী আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে যেতেন। কিন্তু সাম্প্রতিককালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেই শিক্ষার্থীদের একটা বিশেষ অংশ বিদেশ চলে যাচ্ছেন। তাদের অনেকেই মেধাবী। সম্ভাবনাময় এসব শিক্ষার্থী মেডিকেল, প্রকৌশল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণই করেননি।
এ মাসের শেষ দিকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সূচি ঘোষণা করেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় বলা যায়, মেডিকেল ও বুয়েটে আগে আগে ভর্তি পরীক্ষা হবে। একটা সময় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই ফলাফলের অপেক্ষা না করে মেডিকেল, প্রকৌশল, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিংয়ে ভর্তি হতেন। অনেকে এখন তা করেন। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী আইইএলটিএস, টোফেল, জিআরইসহ বিভিন্ন দেশের ভাষা শেখার কোচিংয়ে ভর্তি হচ্ছেন। অভিভাবকরা ব্যাংকে তাদের সন্তানের জন্য স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলছেন। ব্যাংকে টাকা জমা রাখছেন, লেনদেন বাড়াচ্ছেন আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে। মূলত মানসম্মত শিক্ষার অবারিত সুযোগের ঘাটতি, লেখাপড়া শেষ করে বেকার হওয়ার আশঙ্কা তথা যোগ্যতা অনুযায়ী উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব, কর্মসংস্থান হলেও চাকরিকালে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদার অভাব, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, প্রভৃতি কারণে উন্নত ও নির্ঝঞ্ঝাট ভবিষ্যতের আশায় বিদেশমুখী হচ্ছেন মেধাবী শিক্ষার্থীরা। উন্নত দেশে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে উন্নত শিক্ষা ও যোগ্যতা দরকার। কেবল অভিবাসনকে সামনে রেখে যেনতেনভাবে মোটামুটি একটি ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে বিদেশ যাওয়াটা হতাশার। অনেকে আছেন, যারা বাংলাদেশে তেমন ভালো রেজাল্ট করতে পারেননি, ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে তেমন একটা দক্ষ নন, ভালো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চান্স পাননি, বিদেশে তাদের কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই তাদের অনেকেই জমিজমা বিক্রি করে, ধারদেনা করে, ব্যাংক ঋণ নিয়ে টিউশিন ফির অর্ধেক পরিশোধ করে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে ‘কোনোরকমে’ বিদেশ যেতে দেখেছি।
এভাবে মেধা ও অর্থ দুটিই আমাদের দেশ থেকে পাচার হচ্ছে। অর্থ পাচারের চেয়ে মেধা পাচারের পরিণতি ভয়াবহ। অনেকে ‘রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন’ তত্ত্ব দিয়ে মেধাবীদের বিদেশমুখিতার পক্ষে যুক্তি দেখান। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ তত্ত্ব অসার। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০০৮-০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া ব্যাপকহারে শিক্ষার্থীদের বিদেশ গমনের পর দেড় যুগ পাড় হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে তাদের লেখাপড়া শেষ হয়ে অনেকেই উন্নত দেশগুলোয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, নাগরিকত্ব নিয়েছেন। ব্যর্থ অনেকে দেশে ফিরলেও প্রতিষ্ঠিত ও যোগ্যদের দেশে ফেরার সংখ্যা খুবই কম।
মেধাবী, ইংরেজিতে দক্ষ ও আর্থিক সামর্থ্যবান, স্কলারশিপ বা টিউশন ফি ওয়েবারপ্রাপ্তরা বিদেশ যেতেই পারেন। যথাযথভাবে কোর্স সম্পন্ন করলে বিশ্বের যেকোনো দেশে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। উন্নত দেশে অভিবাসন ও ক্যারিয়ার গড়ার অনেক পথ আছে। শিক্ষার্থীরা চাইলে দেশেই ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো ফলাফলসহ লেখাপড়া সম্পন্ন করেও সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন। একজন শিক্ষার্থী কোথায় পড়বেন বা অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে কোথায় পড়াবেন, এটি তাদের একান্ত সিদ্ধান্ত। তবে মেধা ও অর্থ পাচার ঠেকাতে আমাদের যা করতে হবে তা হলো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্পন্ন লেখাপড়া ও গবেষণা নিশ্চিত করার পাশাপাশি যোগ্য ও দক্ষদের জন্য যথাযথ কর্মসংস্থান, চাকরিকালীন অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও অমর্যাদাকর কার্যকলাপ বন্ধ ও সবার জন্য উপযুক্ত সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করা চাই। মেধাবীরা জাতীয় সম্পদ, তাদের প্রতিপালন করা রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। কিন্তু এর জন্য আনুষঙ্গিক কাজগুলো করা দরকার বলে মনে করি, তাই এই বিষয়গুলো উল্লেখ করেছি। নীতিনির্ধারকরা সেই দিকে মনোযোগ গভীর করলে মঙ্গল। মূলত মেধাবী ও যোগ্যদের মর্যাদাকর ভবিষ্যৎ নিশ্চিতই পারে তরুণদের বিদেশমুখিতা ঠেকাতে।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন গবেষক। উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট।
jahirul-psa@sust.edu