সম্প্রীতির আপদ, বিভাজনের রেখা

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৩ এএম

বহুভাষী ভারতের অনেক প্রাদেশিক ভাষার ন্যায় হিন্দিও আঞ্চলিক ভাষা। হিন্দি ভাষা কেন ও কীভাবে ভারতের সরকারি ভাষায় পরিণত হলো এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পেছনে ফিরে যেতে হবে। ব্রিটিশ ভারতে ভারতীয় বুর্জোয়ারা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এককেন্দ্রিক শাসনের পাশাপাশি এক-ভাষা ও এক-জাতির আওয়াজ তুলেছিল। তারা জাতি হিসেবে ভারতীয় এবং ভাষা হিসেবে দেবনাগরী লিপির হিন্দুস্তানি ভাষাকে ভারতের সমগ্র জাতিসত্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফন্দি এঁটেছিল। ১৯১৫ সালে ভারতে ফিরে এসে গান্ধী সারা ভারত ভ্রমণ করেন। তখনই তিনি দেখতে পান ভারতীয় মাড়োয়ারি পুঁজিপতিরা গো-রক্ষা এবং হিন্দি ভাষা প্রচলনে নানা তৎপরতায় লিপ্ত। সিন্ধু ন্যাশনাল কলেজে ১৯২০ সালের জুলাইতে গান্ধী বলেছিলেন, ‘হিন্দিই হবে সমগ্র ভারতের ভাষা এবং সেজন্য হিন্দি শেখা অন্য সমস্ত প্রদেশের কর্তব্য।’ ১৯২১ সালে এক চিঠিতে গান্ধী মাড়োয়ারি পুঁজিপতিদের উদ্দেশে লেখেন, ‘ভারতবর্ষে ফিরে আসার পর থেকেই আমি আপনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হচ্ছি। আমার কাজে আপনারা প্রশ্রয় দিয়েছেন...। হিন্দি প্রচারের আন্দোলনকে আপনারা কার্যকরভাবে সমর্থন দিয়েছেন।’ গান্ধীর হিন্দি-ভাষা প্রচারাভিযানে মাড়োয়ারিদের পাশাপাশি গুজরাটি, পার্শি বণিক শ্রেণিও আর্থিক সহায়তা প্রদানে পিছিয়ে ছিল না। বাংলা ও আসাম প্রদেশে হিন্দি প্রচারাভিযানে ১৯২৮ সালে পুঁজিপতি ঘনশ্যামদাস বিড়লাকে কোষাধ্যক্ষ করে কলকাতায় হিন্দি প্রচারের এক সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৫ সালে হিন্দি-ভাষাকে জাতীয় ভাষায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজেন্দ্রপ্রসাদকে সভাপতি করে হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে ‘রাষ্ট্রভাষা প্রচার সমিতি’ গঠিত হয়। পরবর্তীকালে রাজেন্দ্রপ্রসাদ লিখেছিলেন, ‘এর নীতি স্বয়ং গান্ধীজি নির্ধারণ করেছিলেন এবং আমাদের শিল্পপতি বন্ধুরা অর্থের জোগান দিতেন।’

১৯৩৭ সালের অক্টোবরে লক্ষেèৗতে মুসলিম লীগ অধিবেশনে সব মুসলিম সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতের জাতীয়-ভাষা হিসেবে হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান। ১৯২৭ সালের জুলাইতে গান্ধী লিখেছিলেন, ‘সব ভারতীয় ভাষার একটি লিপি হওয়া উচিত এবং কেবল দেবনাগরীই হতে পারে সেই লিপি।’ হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভক্তি ব্রিটিশরা করেছিল তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এবং দখলদারিত্ব স্থায়ী করার লক্ষ্যে। গান্ধীও হিন্দুস্তানি-ভাষা ও দেবনাগরী লিপির পক্ষে সম্প্রদায়গত বিভাজনের নীতি অনুসরণ করে সেই বিভাজনকেই সামনে নিয়ে এসেছিলেন। অথচ গান্ধী নিজে হিন্দিভাষী ছিলেন না, তার মাতৃভাষা গুজরাটি। হিন্দি ভাষা ও দেবনাগরী লিপিকে জাতীয় ভাষা ও লিপির আন্দোলন অভিযানের ফলে দ্রুতই মুসলিম সম্প্রদায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মুসলমানদের বিরোধিতার মুখে গান্ধী-নেহরুরা মত পরিবর্তন করলেও, উর্দুভাষী মুসলিম সম্প্রদায় হিন্দি-উর্দু ভাষা বিতর্কে সরব হয়ে ওঠে এবং ভাষা নিয়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত ঘটে। ১৯৩৭ সালের জুলাইতে কংগ্রেস সভাপতি নেহরু বলেন, ‘অবশ্যই হিন্দি অথবা হিন্দুস্তানি হচ্ছে জাতীয় ভাষা এবং হওয়া উচিতও। লিপি সম্পর্কে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা দরকার যে, হিন্দি ও উর্দু দুই লিপিরই সহাবস্থান করা উচিত।... এই বিতর্ক বন্ধ করার জন্য ভালো হবে যদি আমরা কথ্য ভাষাকে হিন্দুস্তানি এবং লিপিকে হিন্দি অথবা উর্দু আখ্যা দিই। ইউরোপের প্রসিদ্ধ গ্রন্থগুলোর হিন্দিতে অনুবাদ হওয়া একান্ত দরকার।’ নেহরুর বক্তব্যের সার কথা হচ্ছে, হিন্দিই হবে ভারতের জাতীয় ভাষা। সেটা দেবনাগরী কিংবা উর্দু দুই লিপিতেই লিখিত হতে পারে। ভাষা প্রশ্ন গ্রন্থে নেহরু লিখেছিলেন, ‘একমাত্র হিন্দুস্তানিই সমগ্র ভারতের ভাষা হতে পারে।’ লিপির ক্ষেত্রে দেবনাগরী এবং উর্দু লিপির কথা মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষোভ প্রশমনে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

১৯৪৭ সালে গান্ধী হিন্দুস্তানি ভাষাকে সমগ্র এশিয়ার ভাষায় পরিণত করার স্বপ্নও দেখেছিলেন। মুসলিমদের বিরোধিতার কারণে গান্ধী-নেহরু ভারতের জাতীয়-ভাষা হিন্দির পরিবর্তে হিন্দুস্তানি কথ্য ভাষার প্রচারণা ছিল কৌশলমাত্র। উদ্দেশ্য ছিল দেবনাগরী লিপির বাতাবরণে হিন্দি ভাষাকেই সমগ্র জাতিসত্তার স্কন্ধে চাপানোর। বাস্তবতা হচ্ছে হিন্দুস্তানি-ভাষা প্রকৃতই কথ্য ভাষা। সে ভাষার লিপি ছিল না, সাহিত্যও ছিল না। হিন্দুস্তানি ভাষার দাবিটি ছিল হিন্দি-ভাষা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কৌশল মাত্র। ১৯৪৭ সালে সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পূর্বে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভারতের রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে কোনো ধারা রাখা হয়নি, হিন্দি-ভাষা উত্থাপনে বিতর্ক-বিভক্তির আশঙ্কায়। সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান বি আর আম্বেদকর বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস হিন্দি ভাষার ধারা নিয়ে যতটা বিতর্ক করেছেন, অন্য কোনো ধারা নিয়ে অতটা বিতর্ক করেনি।’ সংবিধান সভার কংগ্রেসের সদস্যদের মনোনীত করেছিলেন জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। জাতীয় ভাষা নির্ধারণের ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৮টি এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৮টি ভোট পড়ে। সমাধানের লক্ষ্যে পুনরায় ভোটাভুটিতে হিন্দির পক্ষে ৭৯টি এবং হিন্দির বিপক্ষে ৭৭টি। মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে হিন্দি-ভাষা ভারতের সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। আর এই এক ভোটের ব্যবধান গড়ে গিয়েছিলেন বাঙালি সাহিত্যিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।

স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতির সচিব সি এস ভেঙ্কটাচার লিখেছেন, ‘হিন্দি ভাষার প্রশ্নে অশুভ তাৎপর্য মুসলিম সম্প্রদায়কে যথার্থই আতঙ্কিত করেছিল। মুসলমানরা উপলব্ধি করেছিল তাদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন। এই বিশ্বাস দ্রুত মুসলমান সম্প্রদায়ের মনের ওপর অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপেই পাকিস্তান সৃষ্টিতে এটি অন্যতম মুখ্য কারণ হয়েছিল।’ ভাষার দ্বন্দ্বে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বিভক্তি সাম্প্রদায়িক বিভক্তিরই অনুষঙ্গ। অপরিণামদর্শী দেশভাগ, রক্তাক্ত দাঙ্গা, উচ্ছেদ, বিচ্ছেদ, উৎপাটনের ইতিহাস উপমহাদেশের সর্বাধিক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। শান্তির প্রত্যাশা মুখ্যত বারবার এ কারণে হোঁচট খেয়েছে। ভারত-পাকিস্তান দুই দেশে হিন্দি-উর্দু ভাষা সরকারি এবং রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রাধীন পূর্ব বাংলায় উর্দু ভাষা চাপানো সম্ভব হয়নি। আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-আত্মত্যাগে মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত