সান সিরোতে ইন্তার মিলানকে ৪-৩ গোলে স্তব্ধ করে হ্যাটট্রিক উপহার দেন বেলজিয়ান ক্লাব 'ক্লাব ব্রুগা'র ২২ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড নিকোলো ট্রিসোলডি। গ্যারেথ বেলের পর সান সিরোর মাটিতে সফরকারী খেলোয়াড় হিসেবে ইন্তারের বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়নস লিগে হ্যাটট্রিক করার অবিশ্বাস্য নজির এখন কেবল এই তরুণ তুর্কিরই।
তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ছোটবেলা থেকেই ইন্তারের নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের অন্ধ ভক্ত ট্রিসোলডি, আর নিজের প্রিয় ক্লাবের চিরশত্রুদের তাদেরই ঘরে ধসিয়ে রাতারাতি ইউরোপিয়ান ফুটবলের মূল আকর্ষণে পরিণত হয়েছেন তিনি। এমন তাণ্ডবের পর ফুটবলপ্রেমীদের মনে একটাই প্রশ্ন, কে এই নিকোলো ট্রিসোলডি?
২০০৪ সালের ২০ আগস্ট ইতালির ক্যালিয়ারিতে জন্ম নেন নিকোলো ট্রিসোলডি। তার বাবা ইমানুয়েল ট্রিসোলডিও জন্মসূত্রে ইতালিয়ান। তিনি ছিলেন আতালান্তা ও চেসেনার মতো ইতালিয়ান ক্লাবে খেলা পেশাদার ফুটবলার। আর মা বারবারা কাফি আবার জন্মসূত্রে আর্জেন্টাইন। সব মিলিয়ে ট্রিসোলডি জীবন যেন ফুটবলীয় জায়ান্ট দেশগুলোর মিশেলের এক কবিতা, বাবা ইতালিয়ান, মা আর্জেন্টাইন, তিনি ইতিমধ্যেই খেলেছেন জার্মান যুব দলে আর এখন ক্লাব ফুটবলটা খেলেন বেলজিয়ামে।
২০১৭ সালে ইতালি ছেড়ে জার্মান ক্লাব হ্যানোভার ৯৬-এর বয়সভিত্তিক অ্যাকাডেমিতে যোগ দেওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাজি। হ্যানোভারের মূল দলে ১৪ গোল করার পর ২০২৫ সালের জুনে ৮.৮ মিলিয়ন ডলারে তাকেই ডেরায় ভেড়ায় বেলজিয়ান ক্লাব ব্রুগা। আর বেলজিয়ামে এসেই প্রোগ্রেসিভ ফিনিশিংয়ে ১৯ গোল করে লিগের শীর্ষ গোলদাতা হিসেবে নিজের জাত চেনান তিনি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতালি ও জার্মানি, দুই পরাশক্তির টানাটানির কেন্দ্রে রয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই জার্মানির অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেললেও জন্মসূত্রে ইতালির জাতীয় দলেও খেলার সুযোগ রয়েছে তার।
ট্রিসোলডি তবে বেছে নিবেন কোন জাতীয় দলের জার্সি? ম্যাচ শেষে ইতালির সম্প্রচারমাধ্যম স্কাই স্পোর্ট ইতালিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রিসোলডি বলেন, ‘জার্মানিতে আমি যা করছি তাতে আমি খুশি, দেখা যাক সামনে কী হয়। তবে আমি ঘরে সবসময় ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলি, আমার জন্মও তো ইতালিতে।’
এদিকে ট্রিসোলডিকে নিজেদের ডেরায় ভেড়াতে ইতালির কোচ রবার্তো মানচিনি সান সিরোর গ্যালারিতে স্কাউট পাঠিয়েছিলেন। এ বিষয়ে এক সাক্ষাৎকারে মানচিনি বলেছিলেন, ‘সে জানিয়েছিল সে ৫০ শতাংশ ইতালিয়ান এবং ৫০ শতাংশ জার্মান। আশা করি জুনের মধ্যে সে ৫১ শতাংশ ইতালিয়ান এবং ৪৯ শতাংশ জার্মান অনুভব করবে!’
আলভারেজকে না পেয়ে বার্সায় ট্রিসোলডিকে চেয়েছিলেন ফ্লিক
ইউরোপীয় ফুটবলে নিকোলো ট্রিসোলডির এই হঠাৎ আলোড়ন তোলার ঘটনাটি কিন্তু একেবারেই আকস্মিক নয়। এই মৌসুমের শুরুতে দলবদলের বাজারে রবার্ট লেভানডভস্কির বিকল্প খোঁজার সময় বার্সেলোনার ট্রান্সফার রাডারে জোরালোভাবেই ছিলেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।
তবে স্প্যানিশ জায়ান্টদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আর্জেন্টাইন তারকা হুলিয়ান আলভারেজ ঘিরে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই আলভারেজকে দলে ভেড়ানো নিয়ে জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে বার্সাকে বিকল্প বা 'প্ল্যান-বি' খুঁজতে হয়েছিল, আর সেই তালিকার একেবারে ওপরের দিকেই নাম ছিল ক্লাব ব্রুগার এই সেনসেশনের।
বার্সা কোচ হান্সি ফ্লিক নিজে ট্রিসোলডির বক্সের ভেতরে নিখুঁত পজিশনিং, গোলের দারুণ ঘ্রাণ এবং সতীর্থদের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়ার মুন্সিয়ানায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। ফ্লিক ব্যক্তিগতভাবে তাকে লেভানডভস্কির যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। যদিও শেষ পর্যন্ত আলভারেজই ছিল বার্সার এক নম্বর অগ্রাধিকার, তবুও বাজারমূল্য প্রায় ২৯ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো ট্রিসোলডিকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই ট্র্যাক করছিল কাতালানরা।
এর আগে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মঞ্চে বার্সেলোনা ও আতলেতিকো মাদ্রিদের মতো পরাশক্তিদের বিপক্ষে গোল করার অভিজ্ঞতাটাও আছে ট্রিসোলডির। তাই তো জাতীয় দলগুলো যেভাবে মেতেছে এই তরুণ তারকাকে ভেড়াতে সময় গড়িয়ে তিনি ক্লাব ফুটবলেও চাহিদার নামেও পরিণত হবেন তা বলাই বাহুল্য।