ভেজাল দুধের চক্র ভাঙতে কঠোর অভিযানের নির্দেশ

দেশের অন্যতম প্রধান দুগ্ধ উৎপাদন অঞ্চল পাবনা-সিরাজগঞ্জে নকল ও ভেজাল দুধের কারবার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ না করে ভেজাল দুধের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অচিরেই পাবনা থেকে ভেজাল দুধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১৪ অক্টোবর) দুপুরে পাবনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় দুগ্ধ খামারি, উৎপাদক, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা জানানো হয়। সভায় ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধান অতিথি হিসেবে যুক্ত ছিলেন শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান। এ ছাড়া জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলাম।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নকল দুধ তৈরির কারখানা শনাক্ত করে দু-একজনকে জরিমানা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ভেজাল দুধের সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে দিতে হবে। এই সংকটকে কাজে লাগিয়ে কোনো অসাধু চক্র যেন সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। পাশাপাশি দুগ্ধ খাত পুনর্গঠন এবং তরল দুধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন মন্ত্রী।

বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান জানান, ভেজাল দুধের কারবার বন্ধে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত আধুনিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। খুব শিগগিরই পাবনা অঞ্চল থেকে জিরো টলারেন্স অভিযান শুরু হবে বলেও জানান তিনি। এ কাজে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন বাণিজ্যসচিব।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জহিরুল ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমে নকল ও ভেজাল দুধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মন্ত্রীর উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে এই মতবিনিময় সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এ অপরাধ বন্ধ করার চেষ্টা করা হবে।

সভায় স্থানীয় খামারি ও তাদের প্রতিনিধিরা গোখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দুধ বিপণনের নানা চ্যালেঞ্জ এবং নকল দুধের চক্রের প্রভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের বক্তব্য, পাবনা-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলে উৎপাদক থেকে শুরু করে পাইকার, সংগ্রহকারী, দুধ শীতলীকরণ কেন্দ্র এবং বাজারব্যবস্থার একটি অংশের যোগসাজশে নকল দুধের কারবার চলছে।

বক্তারা জানান, গত এক বছরে পাবনায় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও ভেজাল দুধের কারবার বন্ধ হয়নি। তাঁদের মতে, এ পরিস্থিতি প্রচলিত ব্যবস্থার স্থায়ী দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

ভেজাল দুধ শনাক্তের ক্ষেত্রেও রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। পাবনায় স্থায়ী কোনো পরীক্ষাগার না থাকায় ভেজাল নির্ণয়ে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগারের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ সমস্যা সমাধানে পাবনায় স্থায়ী ও স্বীকৃত পরীক্ষাগার স্থাপন, প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং ডিজিটাল অনুসরণ ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান বক্তারা।

দুগ্ধ খামারি মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, প্রান্তিক খামারিরা কোনোভাবেই ভেজাল দুধ তৈরির সঙ্গে যুক্ত নন। গুটিকয়েক অসাধু চক্রের কারণে পুরো দুগ্ধ খামার খাত হুমকির মুখে পড়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের দুগ্ধশিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু তালেব বলেন, দুধে যেসব ক্ষতিকর রাসায়নিক ও উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে, তা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ভোক্তারা দুধের ওপর আস্থা হারালে পুরো দুগ্ধ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও জানান, দুধ প্রাণিজ পণ্য হলেও দুধ শীতলীকরণ কেন্দ্রগুলোর লাইসেন্স দেয় কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর। তাই ভেজাল প্রতিরোধে প্রাণিসম্পদ বিভাগকে তদারকির পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাগার ও সরঞ্জাম সরবরাহের আহ্বান জানান তিনি।

সভায় জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, দুগ্ধ খামারি প্রতিনিধি ও স্থানীয় সুধীজনেরা উপস্থিত ছিলেন।