ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির (আইইউডিএস) সভাপতির বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে কমিটি গঠন ও অর্থের তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির অভ্যন্তরে বিরোধ দেখা দিয়েছে। সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে দুটি হল ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিনিধিরা সভা থেকে ওয়াকআউট করেছেন। পাশাপাশি কয়েকটি হল ডিবেটিং সোসাইটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এরই মধ্যে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকসহ কার্যনির্বাহী কমিটির তিন নেতা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সংগঠনটির মডারেটর ও সহকারী মডারেটরের সিদ্ধান্তকে একপাক্ষিক বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়, আইইউডিএসের কমিটি গঠনের সময় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সভাপতি পদে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের পরবর্তী সময়ে সহসভাপতি হিসেবে মনোনীত করা হবে। একইভাবে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করার সিদ্ধান্ত ছিল। তবে কমিটি গঠনের সময় নির্বাচিত সভাপতি সেই নিয়ম অনুসরণ করেননি বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ভুক্তভোগীরা কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানালেও তা কার্যকর করা হয়নি।
এ ছাড়া গত ১১ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় অর্থের হিসাব জানতে চাওয়া হলে বর্তমান সভাপতি ইয়াছিন আলী অর্থ হস্তান্তরের তথ্য গোপন করেন বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১ বা ২ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির সাবেক সভাপতি আবু হুরায়রা ১৮ হাজার ৫৮০ টাকা হস্তান্তর করেছিলেন। কিন্তু ওই অর্থের তথ্য কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
গত ৫ অক্টোবর সংগঠনটির মডারেটর, উপদেষ্টা ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় অর্থের তথ্য গোপনের বিষয়টি প্রমাণিত হয় বলে জানা গেছে। পরে পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে শুনানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ১৩ অক্টোবরের সভায় অভিযোগের প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত সভাপতি ইয়াছিন আলীকে সতর্ক করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে এ সিদ্ধান্তকে একপাক্ষিক দাবি করে প্রতিবাদ জানান সাদ্দাম হোসেন হল ও জুলাই-৩৬ হল ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিনিধিরা। তারা সভা থেকে ওয়াকআউট করেন।
একই দিন সন্ধ্যায় উদ্ভূত অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিবৃতি দেয় শাহ আজিজুর রহমান হল ডিবেটিং সোসাইটি ও লালন শাহ হল ডিবেটিং সোসাইটি। বিতর্ক অঙ্গনে সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত কার্যকর ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায় তারা।
পরদিন দুপুরে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক লাবিদ ইফতি, সহসভাপতি রাহাত আব্দুল্লাহ এবং প্রেস ও আইটি সম্পাদক তানিম তানভীর একে একে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
পদত্যাগের বিষয়ে সহসভাপতি রাহাত আব্দুল্লাহ বলেন, একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী। অর্থসংক্রান্ত তথ্য গোপনের মতো গুরুতর বিষয় প্রমাণিত হওয়ার পরও সেটিকে অপরাধ হিসেবে স্বীকার করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাহাত আব্দুল্লাহ আরও বলেন, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মতামত ও পরামর্শ উপেক্ষা করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে কোনো সংগঠন পরিচালিত হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করাকে তিনি নিজের জন্য সমীচীন মনে করছেন না।
সাধারণ সম্পাদক লাবিদ ইফতি পদত্যাগের কারণ হিসেবে দুটি বিষয় উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কার্যনির্বাহী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের মধ্যে থাকা অসন্তোষ ও অব্যক্ত অসমর্থন তার জন্য প্রতিকূল কর্মপরিবেশ তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি স্নাতক পড়াশোনার শেষ পর্যায়ে থাকায় তার পড়াশোনার চাপ বেড়েছে। ফলে সংগঠনকে পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে সাদ্দাম হোসেন হলের প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, আইইউডিএসের বর্তমান সভাপতির বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে কমিটি গঠন ও অর্থের তথ্য গোপনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও মডারেটর ও সহকারী মডারেটর একপাক্ষিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
শাহ আজিজুর রহমান হল ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিনিধি জানান, সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ ও মডারেটরের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আইইউডিএস ও হল ডিবেটিং সোসাইটিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক বিতর্ক অঙ্গনে। তাই পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের আহ্বান জানান তিনি।
লালন শাহ হল ডিবেটিং সোসাইটির প্রতিনিধিও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিতর্ক অঙ্গনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এ বিষয়ে আইইউডিএসের মডারেটর ড. জুলফিকার আলী বলেন, সিদ্ধান্ত তো একপাক্ষিকই হবে। কারণ বিচার কেউ মানবে, কেউ মানবে না, এটাই স্বাভাবিক। তাদের মত হলে তো দ্বিপাক্ষিক। আমরা মডারেটর ডিবেটের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে সবাই একমত নাও হতে পারে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি এখনো কিছু জানেন না।