সহায়তা বাড়াতে আগ্রহী জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা

জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা বিশ্বের ৫০টি দেশে বিভিন্ন মানবিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। স্বাস্থ্যসেবা, এতিম শিশুদের সহায়তা, শিক্ষা ও দরিদ্র পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে তারা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। গতকাল বুধবার ঢাকা সফরকালে দেশ রূপান্তরকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সংস্থাটির গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট হালিল দেমির।

দেশ রূপান্তর : জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ ডলার সহায়তা দেয়। এই অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়?

হালিল দেমির : আমরা বাংলাদেশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে কাজ করছি। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা, এতিম শিশুদের দেখভালসহ এতিমদের পৃষ্ঠপোষকতা কর্মসূচি। পাশাপাশি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছি। শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমাদের কার্যক্রম রয়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকার শিশুরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাদের শিক্ষার আওতায় আনা। আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুদের টিকাদানসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবাও দেওয়া হয়। এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো পরিবার ও সমাজকে আরও সক্ষম করে তোলা।

দেশ রূপান্তর : আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

হালিল দেমির : হ্যাঁ, বাংলাদেশে সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ উদ্দেশ্যেই আমি বাংলাদেশ সফরে এসেছি। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের জীবনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অনেক পরিবার ঋণের চাপ ও উচ্চ সুদহারের কারণে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের সহায়তা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। তাই এখানকার জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চাই। আশা করছি, আগামী দিনে বাংলাদেশে আমাদের সহায়তার পরিমাণ বাড়াতে পারব।

দেশ রূপান্তর : দরিদ্রদের স্বাবলম্বী করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

হালিল দেমির : অবশ্যই। এ ধরনের উদ্যোগের সম্ভাবনা যাচাই করছি। এতিম শিশুদের পৃষ্ঠপোষকতা কর্মসূচির আওতায় যেসব পরিবার সহায়তা পায়, তাদের মধ্যে অনেক একক মায়ের পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারকে শুধু মাসিক সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে তাদের জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা আমরা ভাবছি। বস্তি এলাকার তরুণদের নিয়েও আমরা কাজ করতে চাই। কোন খাতে কর্মীর চাহিদা রয়েছে, কী ধরনের দক্ষতা অর্জন করলে তারা চাকরি পেতে পারে, এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রমবাজারের উপযোগী করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে কাজ করছে। এক্ষেত্রে কী ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়?

হালিল দেমির : বড় চ্যালেঞ্জের একটি হলো মানুষ্যসৃষ্ট সংকট, বিশেষ করে যুদ্ধ ও সহিংসতা। এসব কারণে অনেক এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বড় মূল্য দেয় সমাজের অসহায় মানুষরা, বিশেষ করে শিশুদের। কিছু গোষ্ঠী নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেখানে আমাদের কাজ করতে বাধা দেয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বাধার কারণেও নির্দিষ্ট অঞ্চলে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে কাজ করার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এসব বাধা সত্ত্বেও আমরা মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করি।

দেশ রূপান্তর : আপনাদের সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না তা কীভাবে নিশ্চিত করেন?

হালিল দেমির : সহায়তার অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিতে একাধিক স্তরের তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। যেসব এলাকায় সহায়তা দেওয়া হয়, সেখানকার কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়। পুরো প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায়ে যাচাই করা হয়, যাতে অর্থের অপব্যবহার বা অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত করা যায়। যেসব দেশে কাজ করি, সেখানে যেমন জবাবদিহির ব্যবস্থা রয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রেও আমাদের শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা আছে। এর মাধ্যমে অনিয়মের ঝুঁকি কমানো এবং সহায়তার অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।

দেশ রূপান্তর : মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় আপনাদের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

হালিল দেমির : রোহিঙ্গা তরুণদের শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আলোচনা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গা তরুণদের কর্মসংস্থান উপযোগী শিক্ষা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারের পরিচয় করিয়ে দেওয়া একটি সংস্থার সঙ্গে আমরা চুক্তি করেছি। প্রকল্পটির কার্যক্রম জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তর তদারকি করবে এবং মাঠপর্যায়ে ওই সংস্থা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্রকল্পে ৫০ লাখ ডলার সহায়তা দেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অন্যান্য সরঞ্জামের জন্য আরও ১০ লাখ ডলার সংগ্রহের চেষ্টা করছি।

দেশ রূপান্তর : জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?

হালিল দেমির : এই সংস্থার বয়স ২৫ বছর। প্রতিষ্ঠানটির মূলত দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত, মুসলিম সমাজে জাকাত দেওয়ার সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। দ্বিতীয়ত, জাকাতের অর্থ যথাযথভাবে সংগ্রহ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। ইসলামে জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এর মাধ্যমে সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সম্পদের বৈষম্য কমানো সম্ভব। আমরা মনে করেছি, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে একটি কার্যকর জাকাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে এর মাধ্যমে জাকাত সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো সম্ভব হবে। সে লক্ষ্যেই এই সংস্থার যাত্রা শুরু।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো জাকাতের অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা। যুক্তরাষ্ট্রে অনেক মুসলমান জাকাত দিতে চান, কিন্তু ব্যস্ত জীবনযাপন কিংবা উপযুক্ত মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ না থাকায় অনেক সময় তা নিজেরা করতে পারেন না। আমরা তাদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম তৈরি করেছি। কেউ গাজা, আফগানিস্তান, লাতিন আমেরিকা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্র মানুষের জন্য সহায়তা দিতে চাইলে আমরা সেই অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যে ব্যয় করি। আমাদের কার্যক্রম শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যসহায়তা দেওয়ার সময় আমরা সহায়তাপ্রার্থীর ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করি না। যারা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তাদের কাছেই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়। করোনাকালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই আমরা ৫০ লাখ পাউন্ড খাদ্য বিতরণ করেছি।