উচ্চশিক্ষার বারোটা!

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (খুকৃবি) ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব ৫০ থেকে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে। পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬ কিলোমিটার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ৯০ কিলোমিটার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ১৫৩ কিলোমিটার, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় ১৮০ কিলোমিটার দূরে। এর মধ্যেই গোপালগঞ্জের প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১০৯ কিলোমিটার দূরত্বে সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হতে যাচ্ছে।

অর্থাৎ গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫০ থেকে ১৮৪ কিলোমিটারের মধ্যে ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, যার মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাদে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি। খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় এই ৪টিতে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভাড়া করা ভবনে পাঠদান চলছে। নতুন করে প্রতিষ্ঠিত শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সাতক্ষীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েরই কার্যক্রমও শুরু হবে ভাড়া করা ভবনে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে সারা দেশের ৫৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টির শিক্ষা কার্যক্রমই চলছে ভাড়া করা ভবনে। কাছাকাছি থাকা এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক, অবকাঠামো, একাডেমিক পরিবেশ ও জনবল কাঠামো নিয়ে সংকটের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতিসহ নানাবিদ অভিযোগও রয়েছে।

১৫ বছরেও পূর্ণতা পায়নি গোবিপ্রবি : ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করা গোবিপ্রবি এখনো নানা সংকটে আটকে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৩টি বিভাগের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন ২৪২ জন। এর মধ্যে ৩০ জন রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। ফলে অনেক বিভাগেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম। বিশ্ববিদ্যালয়টির ৩৩ বিভাগের জন্য গড়ে দুটির বেশি শ্রেণিকক্ষও নেই। রয়েছে ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার ও আবাসন সুবিধার ঘাটতি। ১০টি বিভাগে শিক্ষক রয়েছেন পাঁচজন বা তার কম। এক যুগের বেশি সময় পার হলেও একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

এই বাস্তবতায় কাছাকাছি এলাকায় নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, পূর্বে অনুমোদিত বা প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন বছরের পর বছর নানা সংকট আর অনিয়মের মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, তখন নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন উচ্চশিক্ষার বারোটা বাজাচ্ছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পরিবর্তে ইতিপূর্বে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা অধিগ্রহণ বা ভবন নির্মাণের জন্য যে অর্থ খরচ করা হচ্ছে তা দিয়ে আগে থেকে সংকটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানের উন্নয়ন করা যেত।

ভাড়া ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া ২৬টির মধ্যে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। আলাপে বিশ^বিদ্যালয়ের দুর্বলতা হিসেবে শ্রেণিকক্ষ নেই, লাইব্রেরি নেই, ফলে শিক্ষকদের বানানো সিট মুখস্ত করা, শিক্ষক সংকট, অর্থের বিনিময়ে মানহীন শিক্ষক নিয়োগ, অপরিকল্পিত বিভাগ চালু, জনবল নিয়োগের লক্ষ্যে সক্ষমতার বাইরে গিয়ে নতুন নতুন বিভাগ চালুর তোড়জোড় করার মতো বিষয় উঠে আসে। তাদের মতে, এই ১০ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে পার্শ্ববর্তী যেকোনো কলেজে ভালো পাঠদান হয়।

দেশে জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে একদিনেই ১০টি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার মান ও প্রয়োজনীয়তার যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এই প্রবণতা উচ্চশিক্ষার বিদ্যমান সংকটকে আরও গভীর করছে।

তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উন্নয়ন ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থী ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার আগেই অবকাঠামো ও জনবল কাঠামো তৈরি হচ্ছে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি গৌণ হয়ে পড়ছে।

সংখ্যা নয়, সক্ষমতার হিসাব দরকার :

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের আগে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি বলে মনে করেন জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ‘কতজন শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে, কোন বিষয়ে পড়ানো হবে, প্রয়োজনীয় শিক্ষক কোথা থেকে আসবেন, গবেষণার অর্থায়ন কীভাবে হবে, অবকাঠামো তৈরির সক্ষমতা কতটা এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির মান কীভাবে ধরে রাখা হবে এই উত্তর মেলাতে হবে।’

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নির্ধারণে শুধু জেলার সংখ্যা বা স্থানীয় চাহিদা নয়, আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও দূরত্ব, সম্ভাব্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক সরবরাহ, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং গবেষণার প্রয়োজনও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ উচ্চশিক্ষায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয় কয়টি তা নয়; প্রশ্ন হলো, কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পেরেছে।

শিক্ষার্থীর চেয়ে কর্মচারী বেশি, নিয়োগে ভাগাভাগি ভিসি ও এমপিদের :

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (খুকৃবি) প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই। এর প্রথম উপাচার্য হিসেবে ২০১৮ সালে নিয়োগ পান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খান। তিনি যখন উপাচার্য পদ থেকে মেয়াদ শেষে বিদায় নেন তখন খুকৃবিতে ১০৮ শিক্ষক, ৭৯ কর্মকর্তা এবং ২৫০ কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়ে যান। বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২০০। নিয়োগের তালিকার দিকে তাকালে দেখা যায়, তার মেয়াদে ১০৬ শিক্ষকের মধ্যে বাকৃবির গ্র্যাজুয়েট ৪২ জন এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ জন। এই ৬৯ জনকে উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার মিলে নিয়োগ দিয়েছেন। এ সময় রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার। ফলে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে কেন এত নিয়োগ পেলেন তা সহজে অনুমেয়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ইউজিসির এক পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৭৯ কর্মকর্তা এবং ২৫০ কর্মচারীর মধ্যে ৮৫ ভাগ নিয়োগ হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এমপি ও মন্ত্রীদের সুপারিশে।

অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণের আরেকটি চিত্র দেখা গেছে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে দুদকে একটি মামলা চলছে। মামলার প্রধান আসামি তৎকালীন উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী, বর্তমানে তিনি পলাতক। জানা যায়, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সিন্ডিকেট ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমশিনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন পদে ২২০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টি মূলত একটি অ্যাফিলিয়েটিং বা তদারককারী পাবলিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে থাকা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ এবং নার্সিং ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের তদারকি করার কথা। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সরাসরি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, মানসম্মত শিক্ষক কোথায়?

শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে যোগ্য শিক্ষক, গবেষণা অবকাঠামো ও একাডেমিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও জনদাবি গুরুত্ব পাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, গবেষণার সক্ষমতা, ল্যাবরেটরি, গ্রন্থাগার, আবাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সক্ষমতা কতটা রয়েছে সেই প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন মনে করেন, দেশে বর্তমানে বড়জোর ১৫টি বিশ^বিদ্যালয় মানসম্মতভাবে পরিচালনা করার মতো যোগ্য শিক্ষক আছেন। তার হিসাবে, ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যেখানে প্রায় ৮ হাজার যোগ্য শিক্ষক প্রয়োজন, সেখানে ১৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক জোগাড় করা বড় চ্যালেঞ্জ।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতার শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ ওপেন সিক্রেট। আমাদের নিয়োগ বোর্ডে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য সভাপতিত্ব করেন, ফলে তারাই সর্বেসর্বা। নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করতে এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।’

তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে একটি মডেল দেন। তার মতে, প্রাথমিক যাচাইবাছাই শেষে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে যারা প্রশ্ন তৈরি করবেন তারা খাতা মূল্যায়ন করতে পারবেন না, আর এর নেতৃত্বে থাকবেন অনুষদের ডীন ও বিভাগীয় প্রধান। এরপর লিখিত পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবে তারা ডেমো ক্লাস নেবে এটা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সামনে হতে হবে। শিক্ষার্থীরা স্বাধীনভাবে নম্বর দেবে। সর্বশেষ ধাপে যারা লিখিত ও ডেমো ক্লাসে উত্তীর্ণ হবে তাদের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যসহ উচ্চপর্যায়ের বোর্ড ভাইভা নিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে। এতে তিন স্তরে ফিল্টারিং থাকায় আর্থিক লেনদেন ও তদবির বন্ধ হবে।