ব্যক্তিগত আচরণ ও সামাজিক সম্পর্ক পরিচালনায় ধর্মের সর্বোচ্চ গুরুত্ব রয়েছে। ধর্মই হলো মানবীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের উৎস এবং সর্বোচ্চ আদর্শের পরিমাপক। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ও পারস্পরিক লেনদেনে ইসলাম নিজস্ব নীতি, আদর্শ ও বিধিবিধানের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা দেয়।
বর্তমান যুগে আধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ এবং তা দ্রুত উন্নত করার প্রচেষ্টা চলছে। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন এমন এক বাস্তবতা, যা থেকে কোনো ঘরই মুক্ত নয়। এমনকি চলাফেরা, ভ্রমণ ও জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানুষ এসব মাধ্যম ব্যবহার করছে। তাই এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধিবিধান, নৈতিকতা ও শিষ্টাচার স্মরণ করিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
হে ইমানদার ভাইয়েরা! সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য এক বিশাল নেয়ামত। আমাদের হৃদয়, জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা আবশ্যক। নেয়ামতের শুকরিয়া হলো, এই মাধ্যমগুলোকে মহান আল্লাহর আনুগত্য ও সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা এবং প্রতিটি প্রকাশিত লেখা ও কথার মাঝে তার নজরদারির অনুভূতি রাখা। কারণ তিনি চোখের খেয়ানত এবং অন্তর যা গোপন করে তা খুব ভালোভাবেই জানেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনি এমন সব আশ্চর্যজনক ও অদ্ভুত বিষয় দেখতে পাবেন, যা পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং সমাজের সৌহার্দ্যরে বন্ধন ছিন্ন করে। মানুষের ধর্ম, চরিত্র, বুদ্ধি ও সম্পদের ওপর আক্রমণ চালানো হয়। আর মূর্খ ও হীন ব্যক্তিরা তা লুফে নেয় এবং গুজব ও অপপ্রচারের বিস্তার ঘটায়। তাই এই ভুয়া প্ল্যাটফর্ম এবং মিথ্যা সাইটগুলোর সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক, যেখানে আবর্জনা ও হীন উপাদানের ছড়াছড়ি।
হে মুসলিম সম্প্রদায়! কথার দায় অত্যন্ত গুরুতর। কথা এমন এক অস্ত্র, যার দুটি দিক রয়েছে। এটি এমন এক বার্তা, যার বিপরীতমুখী দুটি ফল হতে পারে। চাইলে কথা হতে পারে উজ্জ্বল সূর্যের মতো, আবার তা জ্বালিয়ে দেওয়া আগুনও হতে পারে। কথা হতে পারে চূড়ান্ত প্রমাণ, আবার তা হতে পারে আঘাতকারী তলোয়ার কিংবা ক্ষতিকর কোনো বিষয়। কথা সম্মান ও মর্যাদার বাহক হতে পারে, আবার তা সম্মানহানির কারণও হতে পারে। কথা মানুষকে আনন্দ দিতে পারে, আবার ধ্বংসের বার্তাও বহন করতে পারে। কথা মধুর চেয়েও মিষ্টি হতে পারে, আবার যন্ত্রণার চেয়েও বেশি কষ্টদায়ক হতে পারে।
কখনো একটি কথা আঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর হয়। কত কথা যে তার বক্তার জন্য বিপদ ডেকে আনে! তাই কথা বলার আগে সতর্ক হওয়া জরুরি।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন একটি কথা বলে, যার গুরুত্ব সে নিজেও উপলব্ধি করে না। অথচ সেই কথার কারণে আল্লাহ তার মর্যাদা বহু গুণ বাড়িয়ে দেন। আবার কোনো ব্যক্তি আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন একটি কথা বলে, যার পরিণতি সে উপলব্ধি করে না। অথচ সেই কথার কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি ৬৪৭৮)
সুতরাং মানুষ যা লেখে, মুখে যা বলে, অন্যের প্রকাশিত বিষয় পুনরায় প্রচার করে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা শেয়ার করে, সেসব বিষয় সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং হিসাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে, যে তা লিপিবদ্ধ করে।’ (সুরা কাফ ১৮)
আপনারা জিহ্বাকে সংযত রাখুন, যেন কোনো কথা বলে বিপদে পড়তে না হয়। কেননা অনেক সময় বিপদ মানুষের মুখের কথার কারণেই নেমে আসে। এর চেয়েও ভয়াবহ বিষয় হলো, আধুনিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটারভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করে জালিয়াতি ও প্রতারণা করা। ভিডিও সম্পাদনা করে মিথ্যা দৃশ্য তৈরি করা, কণ্ঠস্বর নকল করা, অন্যের পরিচয় ধারণ করা এবং মিথ্যা বক্তব্য কারও নামে চালিয়ে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
এসব কাজ শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম মিথ্যাচারের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষের সম্মান ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর আঘাত হানে। এসবের মাধ্যমে অন্যায় প্রচার ও মিথ্যার প্রসারে সহায়তা করা হয়।
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘হে ওই সম্প্রদায়! যারা মুখে ইমান এনেছ, অথচ ইমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলমানদের কষ্ট দিয়ো না, তাদের দোষারোপ করো না এবং তাদের গোপন দোষত্রুটি অনুসন্ধান করো না। কেননা যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তার গোপন দোষ অনুসন্ধান করেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন, তাকে তিনি অপমানিত করেন, সে তার উটের হাওদার ভেতরে অবস্থান করে থাকলেও।’ অর্থাৎ সে যদি কোনো সুরক্ষিত স্থানেও থাকে তবু আল্লাহ তাকে অপমান করে ছাড়বেন। (তিরমিজি ২০৩২)
আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। এর ফলে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হয়, প্রতারণা ছড়িয়ে পড়ে, সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়, সামাজিক নিরাপত্তা বিঘিœত হয় এবং মানুষের মধ্যে ফেতনা ছড়ায়। এসবই অনিষ্ট ও বিপর্যয় সৃষ্টির অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহ বিপর্যয় পছন্দ করেন না।
তাই সতর্ক হোন। বানোয়াট ছবি ও ভিডিও কিংবা কারও নামে প্রচারিত মিথ্যা ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এর মাধ্যমে মিথ্যা ছড়ানো হয়, অসত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজুরাত ৬)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, তাই বর্ণনা করে।’ (সহিহ মুসলিম ৫)
আপনাদের মধ্যে যারা ছদ্মনাম ব্যবহার করে এবং পর্দার আড়ালে থেকে মহান ব্যক্তিত্ব ও সৎ মানুষদের বিরুদ্ধে অপবাদ ছড়ায়, তারা সৃষ্টিকর্তার কাছে তওবা করুন। বারবার তওবা করুন। আপনাদের প্রতিটি লেখা ও বক্তব্যের হিসাব করুন। মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো এবং তাদের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকুন। তাহলে আপনারা দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্য অর্জন করতে পারবে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয় তাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই, তারা অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব ৫৮)
ইসলাম ঐক্য ও সম্প্রীতির শিক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে বিভক্তি ও মতবিরোধ থেকে সতর্ক করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।’ (সুরা আলে ইমরান ১০৩)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের ফলে সংঘটিত অপরাধগুলো এখন আর সচেতন ও বিচক্ষণ মানুষের কাছে অজানা নয়। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে ব্ল্যাকমেল, মানহানি, মিথ্যা ও বানোয়াট ভিডিও ছড়ানো, গুজব, অপপ্রচার, অপবাদ এবং মিথ্যা অভিযোগ প্রচার করা। এ ছাড়া কম্পিউটার ও মোবাইল ফোনে অনুপ্রবেশ, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম, নেটওয়ার্ক ও ভুয়া বার্তার মাধ্যমে আর্থিক প্রতারণা, দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানুষের অর্থ আত্মসাৎ এবং বাণিজ্যিক প্রতারণাও রয়েছে।
একইভাবে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পদ্ধতিতে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, নানা ধরনের সাইবার হামলা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধও উদ্বেগজনকভাবে বিস্তৃত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি এখন সবার নাগালে চলে এসেছে। এর পাশাপাশি উগ্রতা, বর্ণবাদ, ঘৃণা ছড়ানো এবং অশ্লীল ভিডিও প্রচারের মতো কর্মকাণ্ডও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
বহুমুখী এসব অপরাধের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানো জরুরি। যারা নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও আলেমদের নামে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করে কিংবা তাদের নামে বানোয়াট বক্তব্য প্রচার করে সমাজে বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
সমসাময়িক এসব মাধ্যম ব্যবহারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, এগুলোকে দ্বীন ও দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা এবং দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখা।
মহান আল্লাহ সৌদি আরবকে সব ধরনের অনিষ্ট ও বিপদ থেকে রক্ষা করুন। দেশটির নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন অটুট রাখুন। ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র এবং আগ্রাসনকারীদের আক্রমণ থেকে দেশটিকে সুরক্ষিত রাখুন। একই সঙ্গে বিশ্বের সব মুসলিম দেশকেও নিরাপদ রাখুন। আমিন।
৯ অক্টোবর শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। ভাষান্তর করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান