কওমি মাদ্রাসার সংকট ও উত্তরণের পথ

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:১৫ এএম

কওমি মাদ্রাসার বেশ কিছু সংকট রয়েছে। সংকটের কারণ ও উত্তরণের পথ নির্ধারণ করতে হলে বাহ্যিক কারণসহ আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলোর দিকে তাকাতে হবে।

উপমহাদেশের কওমি মাদ্রাসাসমূহের মূল্যবান ঐতিহ্য হলো, আকাবিরে দেওবন্দের চিন্তা-চেতনা, দ্বীনি মেজাজ, একনিষ্ঠতা, আল্লাহভীতি, সুন্নাহর অনুসরণ, আল্লাহমুখী জীবন এবং দ্বীনের খেদমতের মানসিকতা। কওমি মাদ্রাসার লক্ষ্য হলো ইলমের গভীরতা, আমলে সৌন্দর্য, আল্লাহভীতি ও দ্বীনের জন্য ত্যাগী ব্যক্তিত্ব তৈরি করা।

লক্ষ্য : কওমি মাদ্রাসার মূল লক্ষ্য সনদের স্বীকৃতি আদায় কিংবা সার্টিফিকেট অর্জন নয়। এর লক্ষ্য হচ্ছে, যোগ্য মুত্তাকি ও দূরদর্শী আলেম তৈরি করা। যারা কোরআন-সুন্নাহ গভীরভাবে অনুধাবন করে দ্বীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন। সমাজের নতুন নতুন সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম হবেন। আকাবিরে দেওবন্দের অনেক আলেম শিক্ষা শেষে কোনো সনদ গ্রহণ করেননি। কারণ তাদের লক্ষ্য কোনো সনদ ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল, নিজেকে যোগ্য ও মুত্তাকি আলেম হিসেবে গড়ে তোলা এবং নিজেকে দ্বীনের একজন সাচ্চা খাদেম হিসেবে গড়ে তোলা।

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থান : সনদের স্বীকৃতি, উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই বিবেচনাযোগ্য। কিন্তু স্বীকৃতির নামে যদি কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা ক্ষুন্ন হয়, দারুল উলুম দেওবন্দের আদর্শ, মূলনীতি ও মত-পথ এবং বিদ্যমান আইনের পরিপন্থী হয়, তাহলে সেই স্বীকৃতি কওমি মাদ্রাসার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। কারণ আমাদের প্রধান চিন্তা হচ্ছে ইলম, আমল-আখলাক ও যোগ্যতার সমন্বয়ে প্রকৃত মুত্তাকি আলেম তৈরি করা। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বিখ্যাত উক্তি, ‘আমরা এক লাঞ্ছিত জাতি ছিলাম, মহান আল্লাহ ইসলাম দ্বারা আমাদের সম্মানিত করেছেন। অতএব ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো পথে সম্মান খুঁজলে, মহান আল্লাহ সম্মানের পরিবর্তে আমাদের অপদস্থ করবেন।’

মনে রাখতে হবে, কোনো ধরনের পদ-পজিশনের স্বার্থে আমাদের বিচ্যুতি হলে কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বিনষ্ট এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা অনিবার্য।

স্বকীয়তা ও যুগ সচেতনতা : কওমি মাদ্রাসার আলেমরা যুগের পরিবর্তন ও সমকালীন সমস্যার ব্যাপারে অসচেতন থাকবেন, এটা হতে পারে না। বরং কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে যুগের নতুন সমস্যা অনুধাবন এবং সেটার সমাধান দেওয়ার মতো যোগ্য আলেম তৈরি করা জরুরি। যে ব্যক্তি নিজের যুগ ও সমকালীন মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয়, তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ। এই কথাটি আমাদের বিশেষভাবে স্মরণ রাখতে হবে।

একইভাবে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা কর্মসংস্থানের উপযোগী করে শিক্ষা কারিকুলামকে আধুনিকায়নের নামে ঢেলে সাজালে দ্বীনি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা, নিজস্ব সিলেবাস, বাহ্যিক কাঠামো, ইখলাস, তাকওয়া, সুন্নাহর অনুসরণ, ইলমের গভীরতা ও আকাবিরে দ্বীনের রেখে যাওয়া আমানত রক্ষা করা দায়িত্বশীল কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব।

সনদের স্বীকৃতি ও কর্মসংস্থানের বৈষম্য : ২০১৮ সালে আইন পাসের মাধ্যমে দাওরায়ে হাদিসের সনদকে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবিতে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি দেওয়া হলেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কওমি আলেমদের সেই অনুযায়ী মর্যাদা প্রদান করা হয়নি।

একই মানের বা কখনো তুলনামূলক কম মানের সনদধারীরা যেখানে উচ্চতর গ্রেড ও পদোন্নতির সুযোগ পান, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ খুবই সীমিত রাখা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্র্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর নিবন্ধন পরীক্ষার ক্ষেত্রেও কওমি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তাদের মূল শিক্ষার বিষয় কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, আরবি, উর্দু, ফার্সি, নাহু-সরফ ইত্যাদি। কিন্তু সাধারণ পরীক্ষায় তাদের বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞানের ওপর প্রতিযোগিতা করতে হয়। এতে একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। মূলত অবাস্তব জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের জন্য বঞ্চনার একটি ফাঁদ পাতা হয়েছে। এ বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এছাড়া সহশিক্ষা বা এমন কর্মপরিবেশ, যেখানে কওমি আলেমদের পর্দা ও দ্বীনি আদর্শ লালন করা কঠিন, সেখানে কওমি আলেমদের চাকরির সুযোগ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের ইমান, আমল ও ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

কারি সনদ ও বাস্তব দক্ষতা : গত ১২ জুলাই বেফাকুল মাদারিসের এক বিজ্ঞপ্তিতে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণদের কেরাত ও তাজবিদ বিষয়ে পরীক্ষার কথা জানানো হয়। কিন্তু কেরাত এমন একটি ব্যবহারিক দক্ষতা, যা শুধু লিখিত পরীক্ষায় বা হিফজের সনদের ভিত্তিতে পুরোপুরিভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। মাখরাজ, সিফাত ও তেলাওয়াতের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো আয়ত্ত করতে কোনো যোগ্য উস্তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়মিত মশক অপরিহার্য। তাই কারি হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি কাওয়াইদের মানদণ্ডে তেলাওয়াত ও দক্ষতায় যথাযথ পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত।

কিতাবকেন্দ্রিক শিক্ষা ফিরিয়ে আনা : কওমি মাদ্রাসার ঐতিহ্য ছিল মূল কিতাবকে কেন্দ্র করে ইলম চর্চা করা। শুধু নোট বা অনুবাদ নির্ভর পড়াশোনা নয়। আরবি ব্যাকরণের যথাযথ প্রয়োগ, মূল আরবি থেকে সরাসরি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করার যোগ্যতা অর্জন। কিন্তু বর্তমানে নোট নির্ভরতা, অনুবাদ নির্ভর পড়াশোনা, গাইড বুকের ব্যাপকতার কারণে ছাত্রদের মূল কিতাবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। তাই মূল কিতাবকে শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে, যাতে করে ছাত্রদের আরবিতে এমন দক্ষতা তৈরি হয় যে, তার পাঠ্যবই এবং যেকোনো আরবি সে পড়তে, অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়।

দুই বছরের দাওরায়ে হাদিস : দাওরায়ে হাদিসের সময়সীমা এক বছর নিয়ে পুনর্বিবেচনা জরুরি। এত অল্প সময়ে সিহাহ সিত্তার বিশাল হাদিস ভাণ্ডার যথাযথভাবে পড়ানো ও বুঝানো কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। বুখারি শরিফসহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবসমূহ তাড়াহুড়ো করে শেষ করতে হয়। ত্হাবি শরিফ, মুয়াত্তায়ে ইমাম মালেক, মুয়াত্তায়ে ইমাম মুহাম্মদসহ বিভিন্ন হাদিসের কিতাবের জন্য আরও বেশি সময় বরাদ্দ করা দরকার। তাই দাওরায়ে হাদিসকে দুই বছরে বিভক্ত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

দক্ষ ব্যক্তি তৈরি : কওমি মাদ্রাসার উদ্দেশ্য বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, প্রকৌশলী কিংবা কোনো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা নয়। বরং কোরআন-সুন্নাহ, তাফসির, হাদিস, ফিকাহ ও সংশ্লিষ্ট ইসলামি জ্ঞানে দক্ষ আলেম তৈরি করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী যুগ সচেতনতা, তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ, পাশ্চাত্যের শিক্ষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলা করার মতো দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেম তৈরি করা। তবে একসঙ্গে একজন ব্যক্তিকে উচ্চমানের আলেম, ডাক্তার, প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানী বানানোর অবাস্তব প্রত্যাশায় মূল দ্বীনি শিক্ষার গভীরতা নষ্ট করা উচিত নয়।

আমাদের সুপারিশ : এক. তাসাউফ ও আখলাকের গুরুত্বপূর্ণ কিতাব সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করা। দুই. ফেরাকে বাতেলা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় কিতাব নেসাবভুক্ত করা। তিন. শিক্ষার্থীদের লেখা সুন্দর করার প্রতি গুরুত্বারোপ করা। চার. কওমি শিক্ষকদের জন্য স্থায়ীভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা। পাঁচ. মাদ্রাসার বাইরের মুসলিম সন্তানদের পবিত্র কোরআন ও প্রয়োজনীয় দ্বীন শিক্ষাদানে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ছয়. ইসলামি রাজনীতি শিক্ষার একটি জরুরি অনুষঙ্গ। অধ্যয়নরত অবস্থায় এটা শিখবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত অবস্থায় এর চর্চা থেকে বিরত থাকবে। সাত. দারুল উলুম দেওবন্দের মূলনীতি-আদর্শ সুরক্ষা এবং ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সংসদের পাসকৃত ৪৮ নম্বর আইন মোতাবেক সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।

লেখক : সভাপতি, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত