হরমুজ নিয়ে ইরানের কৌশল বদল

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে কার্যত তা বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। হরমুজকে ইরান চলমান এই যুদ্ধে ‘ট্রাম্প’ কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে হরমুজ নিয়ে নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে তেহরান। তেহরানের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিদেশি জাহাজে হামলার মাত্রা বাড়িয়েছে ইরান। নতুন কৌশলের বিস্তারিত জানাতে রাজি না হলেও এক কর্মকর্তা বলেন, তেহরানের বিধিনিষেধ অমান্য করা জাহাজের ওপর প্রায় ১০ দিন আগে থেকে ভিন্ন ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োগ শুরু করেছে ইরান। এর ফলেই সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজে জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে। কর্মকর্তারা জানান, নতুন এই কৌশলের আওতায় হামলার ধরন ও তীব্রতা দুটিতেই পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর অন্যতম লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলা।

ইরান যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। এই যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম নতুন রেকর্ড গড়েছে। দৈনন্দিন জীবনে এর তীব্র প্রভাবের কারণে খোদ নিজ দেশেই ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে পৌঁছেছে। দুই কর্মকর্তার একজন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমানোর যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা নস্যাৎ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।’ তারা আরও বলেন, নতুন কৌশল গ্রহণের এই সিদ্ধান্ত ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যায় থেকেই নেওয়া হয়েছে এবং দেশটির সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার পূর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমেই তা বাস্তবায়িত হচ্ছে। নাম না প্রকাশের শর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ইরান তাদের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। ইরানের রাডার ব্যবস্থার বড় অংশ ধ্বংস হওয়ার পর দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ছোট ছোট নৌযানে নিরস্ত্র পর্যবেক্ষক ব্যবহার করছে। তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু, এমনকি ওয়াশিংটনের যুদ্ধজাহাজও শনাক্ত করে আইআরজিসিকে তথ্য দিচ্ছে। ওই কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে একটি ছোট নৌযান থেকে আইআরজিসিকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য দেওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী।

চলমান এই যুদ্ধ ও এর পেছনে মাসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ব্যয়ভার নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণায় প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশটির কংগ্রেসের কাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে, তা বিবেচনা করছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনের আগে আর ইরানে হামলা চালাবেন না। হরমুজ প্রণালি ঘিরে চলমান এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে আরও বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। একদিকে হামলার হুমকি, অন্যদিকে জাহাজের অতিরিক্ত ভাড়া ও চড়া বীমা খরচ সব মিলিয়ে এই নৌপথে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে। ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের (ইউকেএমটিও) তথ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ ও আশপাশের অঞ্চলে তেলবাহী ট্যাংকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে অন্তত পাঁচটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সংস্থা আইএমওর পরিসংখ্যান অনুসারে, এ হামলার হার পরিস্থিতির নতুন করে অবনতি ঘটার ইঙ্গিত দেয়।

হামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক দিনে ইরান হরমুজের বাইরেও কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলবর্তী জলসীমায় জাহাজগুলোকে নিশানা করছে। দ্বিতীয় ইরানি কর্মকর্তা বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে কোনোভাবেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে দেবে না তেহরান। তিনি বলেন, ‘তারা যখনই ভাববে যে তেলের দাম কমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই আমরা তাদের সেই সুযোগ থেকে দূরে ঠেলে দেব। এটা দাবা খেলা।’ তিনি আরও বলেন, এ ধরনের জাহাজগুলো কোথাও নিরাপদ থাকবে না, হরমুজ প্রণালির বাইরেও নয়। এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগন ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।