চীন থেকে সরবরাহ করা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে উন্নত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ইরানের তৈরি খাইবার শেখান ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে এই অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীটি। এটি তৈরি করা সম্ভব হলে ইসরায়েল ও সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যাবে। ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’-এর একটি প্রতিবেদনের বরাতে এসব তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ইরানের নির্ভুল নিশানাভেদী খাইবার শেখান ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণ তৈরির চেষ্টা করছে হুতিরা। পরিকল্পিত ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে। এই দূরপাল্লার সক্ষমতার ফলে পুরো সৌদি আরব এবং ইসরায়েল সরাসরি হুতিদের হামলার আওতায় চলে আসবে।
হুতি বিদ্রোহীদের ওপর জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু এরপরও হুতিরা ইয়েমেনের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই গোষ্ঠী ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, ২০২৫ সালে দুটি সুনির্দিষ্ট চালানের গোপন মালামাল জব্দ করার পর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’ তাদের প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সাধারণ নানা বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সরঞ্জাম গোপনে আমদানির চেষ্টা করা হচ্ছিল। কনফ্লিক্ট আর্মামেন্টের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিন্টজ সংবাদ মাধ্যমটিকে বলেন, ‘এ ধরনের যন্ত্রাংশ আমদানির অর্থ হতে পারে যে তারা (হুতিরা) ইতিমধ্যেই উৎপাদন শুরু করে দিয়েছে, কিংবা এর চেষ্টা চালাচ্ছে, যা হয়তো এখনো পুরোপুরি সফল হয়নি।’ তিনি আরও যোগ করেন, হুতিদের অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে আড়ালে রাখা হয়েছে; ফলে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কতদূর এগিয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন।
চীনের দাবি, তারা হুতিদের ওপর আরোপিত জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে মেনে চলছে। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য মতে, হুতিদের আমদানিকৃত কিছু উপকরণের বেসামরিক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, বেশ কিছু সরঞ্জাম কেবল ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্যই বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। আমদানিকৃত এসব উপকরণের মধ্যে ছিল কাস্টম-মেড ধাতব ক্ষেপণাস্ত্র যন্ত্রাংশ যার মধ্যে ইঞ্জিনের কিছু অংশ ও ক্ষেপণাস্ত্রের মূল কাঠামোর (এয়ারফ্রেম) উপাদান অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত কর্র্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী ডানা এবং খেবার শেখান সিরিজের সলিড-প্রোপেল্যান্ট রকেট মোটরের কিছু অংশও উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া ইয়েমেনি কর্র্তৃপক্ষ কিছু বিশেষ যন্ত্রপাতি, পরীক্ষার সরঞ্জাম এবং কাঁচামাল জব্দ করেছে। এসব কাঁচামালের মধ্যে ছিল ‘অ্যাবলেটিভ মেটেরিয়াল’ যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও গতিলাভের সময় তৈরি হওয়া তীব্র তাপ থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন অংশকে রক্ষা করে।
ইরানের খাইবার শেখান ক্ষেপণাস্ত্রের নামের অর্থ ‘খাইবার ধ্বংসকারী’। ক্ষেপণাস্ত্রটির নিজস্ব পাল্লা ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার। এই সক্ষমতা দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইসরায়েলে আঘাত হানা সম্ভব। দ্রুত মোতায়েন ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতার কারণে ইরানে এই ক্ষেপণাস্ত্রের কদর রয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠিন জ্বালানিচালিত (সলিড-ফুয়েল) মধ্যম পাল্লার খাইবার শেখান ইরানের পুরনো মডেলের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পুরনো ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে উৎক্ষেপণের ঠিক আগে জ্বালানি ভরতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতো; অন্যদিকে খাইবার শেখানে আগে থেকেই জ্বালানি ভরা থাকে এবং এগুলো দ্রুত ট্রাক বা অন্যান্য যানে লোড করে সরাসরি উৎক্ষেপণ করা যায়।