তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের হিসাব-নিকাশ ছেড়ে সম্পূর্ণ এক অনিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ভাবনার পেছনে চার দশক ধরে লেগে থাকা সহজ কথা নয়। বেলজিয়াম থেকে যাত্রা শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফে গবেষণাগার গড়ে তোলার এই দীর্ঘ লড়াইয়ের নায়ক ফ্রান্সিস হালজেন। বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেনের জীবন, গবেষক হয়ে ওঠার পথচলা এবং তার বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে দীর্ঘ সময় ধরে একটি অলিখিত বিভাজন ছিল। একদল বিজ্ঞানী কাজ করতেন ব্ল্যাকবোর্ড আর জটিল সমীকরণ নিয়ে, আর অন্য দল সময় কাটাতেন ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও সংবেদক সাজিয়ে। খুব কম গবেষকই জীবনের মধ্যগগনে এসে নিজের চেনা ঘর ছেড়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক প্রকৌশলগত অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দেওয়ার সাহস দেখান। ফ্রান্সিস হালজেনের জীবন ও গবেষণা সেই বিরল সাহসের এক জীবন্ত দলিল যেখানে ইউরোপের তাত্ত্বিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের ব্ল্যাকবোর্ড একসময় গিয়ে মিশেছে অ্যান্টার্কটিকার দুর্গম বরফক্ষেত্রের বিশাল গবেষণাগারে।
১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের টিয়েনেনে জন্ম নেন ফ্রান্সিস লুই হালজেন। তার শৈশব কেটেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে যাওয়া ইউরোপে। ল্যুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে কেইউ ল্যুভেন) গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা শেষে ১৯৬৯ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল হ্যাড্রন কণার প্রতি সাম্য বা সিমেট্রি ভাঙন সংক্রান্ত সমস্যা। প্রোটন ও নিউট্রনের মতো উপপারমাণবিক কণাগুলোর আচরণকে তাত্ত্বিক কাঠামোর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করাই ছিল তখন তার প্রধান লক্ষ্য। পিএইচডির পরপরই তিনি যোগ দেন জেনেভার ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্ন (ঈঊজঘ)-এ। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সার্নে তিনি কণা পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত সক্রিয় একটি আবহে কাজ করেন। এরপর স্বল্প সময়ের জন্য কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকহেভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরিতে।
১৯৭১ সালে উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের আমন্ত্রণে ছয় মাসের একটি গবেষণা সফরে যুক্তরাষ্ট্রে যান হালজেন। সেই স্বল্পমেয়াদি সফরই তার পেশাগত জীবনের ভূগোল চিরতরে বদলে দেয়। ১৯৭২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ইউরোপীয় তাত্ত্বিক ঘরানা থেকে বেরিয়ে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত ও বহুমুখী গবেষণা পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি তার কাজের ধরনেও পরিবর্তন আনে।
সত্তরের দশকে হালজেনের কাজ ছিল পুরোপুরি কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল ও শক্তিশালী বলের গতিপ্রকৃতি নিয়ে। কিন্তু আশির দশকে এসে তার মনোযোগে একটি স্পষ্ট বাঁক দেখা যায়। তিনি অনুভব করলেন, মানুষ নির্মিত পার্টিকেল অ্যাক্সিলারেটর বা কণা ত্বরণযন্ত্রের শক্তির একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কিন্তু মহাবিশ্ব নিজেই এমন সব অতিউচ্চ শক্তির কণা তৈরি করছে, যা কোনো পার্থিব যন্ত্রে তৈরি করা অসম্ভব। কণা পদার্থবিজ্ঞানের যেসব অমীমাংসিত প্রশ্ন ল্যাবরেটরির কৃত্রিম শক্তিতে যাচাই করা যাচ্ছে না, তার উত্তর হয়তো লুকিয়ে আছে মহাজাগতিক রশ্মি ও নিউট্রিনোর মধ্যে। একজন প্রতিষ্ঠিত তাত্ত্বিক গবেষক হিসেবে নিজের চেনা বলয় ভেঙে তিনি মহাজাগতিক কণার অনুসন্ধানে পা বাড়ান।
কিন্তু এই কণাগুলোকে ধরতে হলে চিরাচরিত গবেষণাগারের দেয়াল যথেষ্ট ছিল না। আশির দশকের মাঝামাঝি হালজেন ও তার সহকর্মীরা এক অস্বাভাবিক সম্ভাবনার দিকে তাকালেন। তাদের মনে হলো, গভীর ও স্বচ্ছ প্রাকৃতিক মাধ্যম ছাড়া এই কণাগুলোর কোনো চিহ্ন ধরা যাবে না। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি কিংবা গভীর খনির বদলে হালজেনের নজর পড়ল অ্যান্টার্কটিকার সাউথ পোলের কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরের দিকে। ১৯৮৭ সাল থেকে শুরু হয় এই ধারণার প্রাথমিক পরীক্ষা, যা রূপ নেয় ‘অ্যামান্ডা’ (অগঅঘউঅ) প্রকল্পে।
কাগজ-কলমে সমীকরণ মেলানো একজন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীর জন্য এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক জগৎ। বরফের ভেতরে আলো কীভাবে পথ চলে, গরম ফুটন্ত পানি দিয়ে কীভাবে দেড়-দুই কিলোমিটার নিচে সুষম গর্ত তৈরি করা যায় এবং সেই প্রচণ্ড চাপ ও ঠা-ায় সংবেদকগুলো অক্ষত রাখা সম্ভব কিনা প্রতিটি প্রশ্নই পদার্থবিজ্ঞানের চেয়ে প্রকৌশল ও মাঠপর্যায়ের অভিযানের দাবি রাখছিল। হালজেন এখানে কেবল তাত্ত্বিক নির্দেশক ছিলেন না; তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের একত্র করা এবং ব্যর্থতার ঝুঁকি মেনে নিয়েও প্রকল্পটিকে এগিয়ে নেওয়ার কেন্দ্রে ছিলেন।
অ্যামান্ডার প্রাথমিক ফলাফল যখন প্রমাণ করল যে, গভীর বরফকে সত্যিই শনাক্তকরণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব, তখন হালজেন ও তার দল হাত দিলেন আরও বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নে। গড়ে তোলা হলো ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’। ২০০৪ সালে বরফের গভীরে গর্ত খুঁড়ে সংবেদক নামানোর কাজ শুরু হয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে স্থাপন করা হয় এর শেষ সংবেদকটি এবং ২০১১ সালের মে মাসে শুরু হয় এর পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। প্রায় এক ঘনকিলোমিটার আয়তনের প্রাকৃতিক বরফ পরিণত হলো বিশ্বের অন্যতম সুবিশাল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রে।
বিজ্ঞানচর্চা পূর্বনির্ধারিত ছকে আটকে থাকে না। কোনো নতুন প্রশ্ন সামনে এলে নিজের পূর্বতন বিশেষজ্ঞ পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে নতুন বিষয় শেখার প্রস্তুতি থাকতে হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সহকর্মীদের নিয়ে একটি অনিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ধারণাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার এই ধৈর্যই হালজেনকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান থেকে আধুনিক কণা-জ্যোতির্বিজ্ঞানের এক অনন্য রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
যে কারণে তার হাতে নোবেল
মহাবিশ্বকে দেখার জন্য মানুষের চিরন্তন হাতিয়ার ছিল আলো। খালি চোখে রাতের আকাশ দেখা থেকে শুরু করে গ্যালিলিওর দূরবীন, কিংবা আজকের মহাকাশ টেলিস্কোপ মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীদের মূল ভরসা তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ। কিন্তু মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও হিংস্র জায়গাগুলো, যেমন কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশ কিংবা সুপারনোভার কেন্দ্রস্থল, প্রায়ই ঘন গ্যাস ও ধূলিকণার এমন এক দুর্ভেদ্য চাদরে ঢাকা থাকে যে সেখান থেকে আলোকরশ্মি সরাসরি বেরিয়ে আসতে পারে না। পথেই তা আটকে যায় বা দিক পরিবর্তন করে। তাহলে মহাবিশে^র সেই চরম প্রান্তগুলোর খবর বিজ্ঞানীরা পাবেন কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর হাজির করেছে এমন এক মৌলিক কণা, যা আলো নয় অথচ মহাবিশ্বের সুদূরতম বার্তা বয়ে আনতে পারে। কণাটির নাম নিউট্রিনো।
নিউট্রিনোর বৈশিষ্ট্য অদ্ভুত। এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং ভর এতই কম যে, তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কণা সাধারণ পদার্থের সঙ্গে প্রায় কোনো বিক্রিয়াই করে না। আলো যেখানে বাধা পেয়ে আটকে যায়, নিউট্রিনো সেখানে আস্ত একটি গ্রহ, নক্ষত্র বা মহাজাগতিক ধূলিমেঘ অনায়াসে ভেদ করে চলে যেতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের শরীর ও গোটা পৃথিবী ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে কোনো দাগ না রেখে।
এই নির্বিকার বৈশিষ্ট্যের কারণেই নিউট্রিনো একই সঙ্গে মহাবিশ্বের নিখুঁত বার্তাবাহক এবং বিজ্ঞানীদের জন্য পরম দুঃস্বপ্ন। কারণ মহাবিশ্বের শক্তিশালী বিস্ফোরণ থেকে ছুটে আসা নিউট্রিনো কোটি কোটি আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে পৃথিবীতে পৌঁছালেও কোনো যন্ত্রে ধরা না পড়ে অনায়াসে বেরিয়ে যায়। এই প্রায়-ভুতুড়ে কণাটিকে ধরার এক অভাবনীয় উপায় উদ্ভাবন এবং সেই মাধ্যমে মহাজাগতিক উচ্চশক্তির কণার অস্তিত্ব প্রমাণের স্বীকৃতি হিসেবেই বেলজিয়ান-আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
হালজেনের বৈজ্ঞানিক ধারণার মূল চমকটি ছিল অ্যান্টার্কটিকার সাউথ পোলের গভীর বরফকে একটি দানবীয় টেলিস্কোপ হিসেবে ব্যবহার করা। সাধারণ ল্যাবরেটরির কোনো ছোট পাত্রে নিউট্রিনো ধরা প্রায় অসম্ভব; এর জন্য দরকার সুবিশাল এবং অতি-স্বচ্ছ একটি প্রাকৃতিক মাধ্যম। দক্ষিণ মেরুর প্রায় দেড় থেকে আড়াই কিলোমিটার নিচের বরফ প্রচণ্ড চাপে বায়ু বুদবুদহীন এবং কাচের চেয়েও স্বচ্ছ। হালজেনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ এই বরফের এক ঘনকিলোমিটার আয়তন জুড়ে স্থাপন করে পাঁচ হাজারের বেশি অত্যন্ত সংবেদনশীল আলোক ডিটেক্টর।
আইসকিউব সরাসরি নিউট্রিনোকে দেখতে পায় না। যখন কোনো উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো বরফের কোটি কোটি পরমাণুর কোনো একটির নিউক্লিয়াসের সঙ্গে কদাচিৎ সজোরে ধাক্কা খায়, তখন তৈরি হয় মিউওন বা অন্য চার্জযুক্ত গৌন কণা। বরফের ভেতরে আলোর গতির চেয়েও বেশি বেগে চলার সময় এই কণাগুলো পেছনে এক ধরনের ক্ষীণ নীল আলো ছড়িয়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘চেরেনকভ বিকিরণ’। বরফের নিচে ঝুলন্ত সংবেদকগুলো সেই নীল আলোর তীব্রতা ও সময় মেপে নিখুঁতভাবে বের করে ফেলে নিউট্রিনোটির শক্তি কত ছিল এবং মহাবিশে^র কোন দিক থেকে সেটি ছুটে এসেছিল।
এই বিশাল গবেষণাগারটি হঠাৎ করে গড়ে ওঠেনি। নব্বইয়ের দশকে ‘অ্যামান্ডা’ নামের ছোট একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমে বরফের ভেতর আলো চলাচলের আচরণ ও ড্রিলিং প্রযুক্তি যাচাই করা হয়। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন দেশের কয়েক ডজন প্রতিষ্ঠানের শত শত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীর যৌথ পরিশ্রমে গড়ে ওঠে আইসকিউব।
২০১৩ সালে আইসকিউব বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করে। গবেষকরা নিশ্চিত করেন যে তারা এমন কিছু উচ্চশক্তির নিউট্রিনো প্রবাহ শনাক্ত করেছেন, যা সৌরজগৎ বা আমাদের ছায়াপথের সৃষ্টি নয়; এগুলোর উৎপত্তি সুদূর মহাবিশে^র চরম শক্তিশালী কোনো উৎস থেকে।
নোবেল কমিটি ফ্রান্সিস হালজেনের এই স্বীকৃতিতে মূলত তিনটি মৌলিক অর্জনকে চিহ্নিত করেছে :
প্রথমত, পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম প্রান্তের গভীর বরফকে একটি মহাজাগতিক কণা শনাক্তকরণযন্ত্রে রূপ দেওয়ার বৈপ্লবিক ধারণা;
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ দেড় দশকের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত যৌথ উদ্যোগের বৈজ্ঞানিক নেতৃত্ব দিয়ে আইসকিউবকে কার্যকর রূপ দেওয়া এবং তৃতীয়ত, মহাজাগতিক উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণের মাধ্যমে ‘নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান’ নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ মাধ্যমের ভিত্তি স্থাপন করা।
আইসকিউবের এই সাফল্য মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের জন্য তুলে দিয়েছে একটি সম্পূর্ণ নতুন চোখ। বরফের নিচের এই চোখ দিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন দেখতে পাচ্ছেন কৃষ্ণগহ্বরের ঘূর্ণি আর দূরবর্তী ছায়াপথের অজানা রহস্য।