৪৫তম বিসিএসে ১৭০২ জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ৪৫তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ ১ হাজার ৮০৭ জনের মধ্যে ১ হাজার ৭০২ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়া ১০৫ জনকে বাদ দিয়ে এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান হলো।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী গত ১৪ অক্টোবর প্রজ্ঞাপনটিতে স্বাক্ষর করেন। ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার প্রজ্ঞাপনটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে ২৬৬ জন, পুলিশ ক্যাডারে ৭১ জন এবং পররাষ্ট্র ক্যাডারে ৯ জন রয়েছেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য, সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, কর, শুল্ক ও আবগারি, আনসারসহ বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

২০২২ সালের নভেম্বরে ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ১৯ মে। লিখিত পরীক্ষা হয় ২০২৪ সালের ২৩ থেকে ৩১ জানুয়ারি। এরপর ২০২৫ সালের জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে মৌখিক পরীক্ষা ও চূড়ান্ত পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

এ বিসিএসে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন ২ লাখ ৬৮ হাজার ১১৯ জন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হন ১২ হাজার ৭৮৯ জন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬ হাজার ৫৫৮ জন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ১ হাজার ৮০৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। পিএসসির সুপারিশের পর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হতে প্রায় ১০ মাস ১৮ দিন সময় লেগেছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষা-২০২২-এর মাধ্যমে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পিএসসির সুপারিশের ভিত্তিতে ১ হাজার ৭০২ জন প্রার্থীকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারের প্রবেশ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী তাঁদের নবম গ্রেডে ৪৪ হাজার থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা বেতনক্রমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগপ্রাপ্তদের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অথবা সরকার নির্ধারিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষে চাকরিসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পেশাগত ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। তাঁদের দুই বছর শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার এ সময় সর্বোচ্চ আরও দুই বছর বাড়াতে পারবে। শিক্ষানবিশকালে চাকরিতে বহাল থাকার অনুপযুক্ত বিবেচিত হলে কারণ দর্শানো ছাড়াই এবং পিএসসির সঙ্গে পরামর্শ ব্যতিরেকে তাঁদের চাকরি থেকে অপসারণ করা যাবে। বুনিয়াদি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন, বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং শিক্ষানবিশকাল সন্তোষজনকভাবে শেষ করার পর চাকরি স্থায়ী করা হবে।

প্রশিক্ষণে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে। এ ছাড়া ৩০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একজন জামানতদারসহ অঙ্গীকার করতে হবে যে, শিক্ষানবিশকালে অথবা শিক্ষানবিশকাল শেষ হওয়ার পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে চাকরি ছাড়লে প্রশিক্ষণকালে পাওয়া বেতন-ভাতা, অগ্রিম, ভ্রমণভাতা, অন্যান্য ভাতা এবং প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয়িত অর্থ ফেরত দিতে হবে।

প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য আরও কয়েকটি শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচলিত সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী তাঁদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হবে। নিয়োগের পর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিরূপ বা ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলে নিয়োগ আদেশ সংশোধন বা বাতিল করার অধিকার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে।

চাকরিতে যোগদানের সময় ৩০০ টাকা মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে যৌতুক গ্রহণ ও প্রদান না করার অঙ্গীকারসংবলিত বন্ড জমা দিতে হবে। কোনো নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করে থাকলে অথবা বিয়ের অঙ্গীকার করে থাকলে তাঁর নিয়োগপত্র বাতিল বলে গণ্য হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নিয়োগপ্রাপ্তদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন বা দখলে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণ দিয়ে একটি ঘোষণাপত্র সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। বিধি অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর ডিসেম্বর মাসে সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির হিসাবও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্তদের সনদ পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ে মিথ্যা বা জাল প্রমাণিত হলে নিয়োগ বাতিল এবং ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে। চাকরিতে যোগদানের জন্য কোনো ধরনের ভ্রমণ বা দৈনিক ভাতা দেওয়া হবে না।

প্রজ্ঞাপনে নিয়োগপ্রাপ্তদের আগামী ১৬ কার্তিক ১৪৩৩, অর্থাৎ ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সংশ্লিষ্ট ক্যাডার নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগ নির্ধারিত কার্যালয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ থেকে ভিন্ন কোনো নির্দেশনা দেওয়া না হলে নির্ধারিত তারিখেই যোগদান করতে হবে। নির্ধারিত সময়ে যোগদান না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি চাকরিতে যোগ দিতে সম্মত নন বলে গণ্য হবেন এবং তাঁর নিয়োগপত্র বাতিল হবে।

file:///C:/Users/ddronline/Downloads/%E0%A7%AA%E0%A7%AB%20%E0%A6%A4%E0%A6%AE%20%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%8F%E0%A6%B8-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%A8%20(1).pdf

প্রজ্ঞাপনে উল্লেখিত পদভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার পদে ২৬৬ জন, পররাষ্ট্র ক্যাডারে সহকারী সচিব পদে ৯ জন এবং পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার পদে ৭১ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া আনসার ক্যাডারে ২২ জন, নিরীক্ষা ও হিসাব ক্যাডারে ১৯ জন, সহকারী কর কমিশনার পদে ২৯ জন এবং শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে ৫৪ জন নিয়োগ পেয়েছেন। সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক পদে ৭ জন ও পরিসংখ্যানবিদ পদে ১ জন, রেলওয়ে পরিবহন ও বাণিজ্যিক ক্যাডারে ৪ জন, সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল পদে ৪ জন এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে ১২ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

এ ছাড়া সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক বা সমমানের পদে ৩ জন, খাদ্য ক্যাডারে সহকারী রক্ষণ প্রকৌশলী পদে ১ জন, রেলওয়ে প্রকৌশলে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী পদে ১ জন, সহকারী যন্ত্র প্রকৌশলী পদে ১ জন এবং সহকারী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী পদে ১ জন নিয়োগ পেয়েছেন। সহকারী বন সংরক্ষক পদে ৪ জন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে ১০ জন এবং সহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) পদে ১ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

মৎস্য ক্যাডারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পদে ২৯ জন, পশুসম্পদ ক্যাডারে ২৮ জন, কৃষি ক্যাডারে বিভিন্ন পদে ১৫২ জন এবং বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে ৩ জন নিয়োগ পেয়েছেন। স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারী সার্জন পদে ৪০১ জন এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে ৮৭ জন নিয়োগ পেয়েছেন। গণপূর্ত ক্যাডারে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে ৪ জন এবং সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) পদে ৩ জন নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া পরিসংখ্যান কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পেয়েছেন ৫ জন।

সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে বাংলা, ইংরেজি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি, প্রাণিবিদ্যা, ইতিহাস, সমাজকল্যাণ, রসায়ন, মনোবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, পদার্থবিজ্ঞান, উদ্ভিদবিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, গণিত, ভূগোল, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, মার্কেটিং, ব্যবস্থাপনা, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং, কৃষিবিজ্ঞান, পরিসংখ্যান, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ, প্রাতিষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়ভিত্তিক নিয়োগের মধ্যে বাংলা বিষয়ে ২৭ জন, ইংরেজিতে ২৫ জন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ২২ জন, দর্শনে ১৫ জন, অর্থনীতিতে ২২ জন, প্রাণিবিদ্যায় ২২ জন, ইতিহাসে ১৬ জন, সমাজকল্যাণে ৯ জন, রসায়নে ২৪ জন, মনোবিজ্ঞানে ৫ জন, ইসলামের ইতিহাসে ২১ জন, পদার্থবিজ্ঞানে ২১ জন, উদ্ভিদবিদ্যায় ২০ জন, সমাজবিজ্ঞানে ৬ জন, গণিতে ২০ জন, ভূগোলে ৮ জন, মৃত্তিকাবিজ্ঞানে ৩ জন, হিসাববিজ্ঞানে ২১ জন, মার্কেটিংয়ে ৫ জন, ব্যবস্থাপনায় ২১ জন, ফিন্যান্স ও ব্যাংকিংয়ে ৪ জন, কৃষিবিজ্ঞানে ৫ জন, পরিসংখ্যানে ৪ জন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপে ১ জন, প্রাতিষ্ঠানিক খাদ্য ব্যবস্থাপনায় ১ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ৩৬ জন নিয়োগ পেয়েছেন।

অন্যদিকে, কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারে সিভিল বিষয়ে ২২ জন, ইলেকট্রিক্যালে ১৫ জন, মেকানিক্যালে ১৭ জন, পাওয়ারে ১৪ জন, ইলেকট্রনিক্সে ২ জন, অটোমোবাইলে ১ জন, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিংয়ে ১ জন, কেমিক্যালে ১ জন, ফুডে ১ জন এবং সার্ভেতে ১ জন ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া নন-টেকনিক্যাল গণিতে ১ জন, ব্যবস্থাপনায় ৩ জন এবং ফার্ম মেশিনারি, রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশনিং ও মেশিনিস্ট বিষয়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ১ জন করে ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজে সিভিল বিষয়ে লেকচারার পদে নিয়োগ পেয়েছেন ২ জন।

দীর্ঘ নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের মধ্য দিয়ে ৪৫তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীদের সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।