সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত সংশোধিত অধ্যাদেশের আওতায় নতুন বিধিমালা প্রণয়ন ও রেট শিডিউল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের কাজ, সেবা ও পণ্য সরবরাহের দরপত্র এবং ক্রয়প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ কার্যকর থাকবে। গতকাল বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে এ নির্দেশনা জারি করা হয়। বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব এবিএম আরিফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিটি দেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন ও রেট শিডিউল প্রকাশের সম্ভাব্য সময়সীমাও নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এ স্থগিতাদেশ কত দিন বহাল থাকবে এবং বর্তমানে চলমান দরপত্র বা ক্রয়প্রক্রিয়ার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এর আগে চলতি বছর ২০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ২১তম বৈঠকে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষা, সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং দীর্ঘদিনের ক্রয়প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক করতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তখন প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং। প্রেস উইংয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি ক্রয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের স্বার্থ সুরক্ষার পাশাপাশি ক্রয়কার্যে অধিক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা হবে। একই সঙ্গে ক্রয় চুক্তি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিধান সম্প্রসারণ এবং উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কার্যপ্রণালি আধুনিকায়ন করা হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর আওতায় প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন শেষ না হওয়া এবং নতুন রেট শিডিউল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব কাজ, সেবা ও পণ্য সরবরাহের দরপত্র আহ্বান ও ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়েছে।
নির্দেশনার অনুলিপি সব সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা পরিষদের প্রশাসকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।
এ নির্দেশনার ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আওতায় নতুন উন্নয়নকাজের দরপত্র আহ্বান, বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং পণ্য কেনার নতুন ক্রয়প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ থাকবে। তবে আগে কার্যাদেশ দেওয়া প্রকল্প বা ইতিমধ্যে বাস্তবায়নাধীন কাজের বিষয়ে চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
এদিকে সরকারের সিদ্ধান্তকে সময় উপযোগী পদক্ষেপ মনে করা হলেও সমালোচকরা বলছেন, সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী যাতে একতরফা সুবিধা দেওয়া না হয়। মূলত এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে জবাবদিহিতার অভাব ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
জানা গেছে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন পর্যায় থেকে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া বা টেন্ডার পদ্ধতিতে পরিবর্তনের দাবি ওঠে। এ ছাড়া সরকারের মধ্য থেকেও আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সংসদের বাজেট অধিবেশনে আইনটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনেও ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে। গত ৩০ আগস্ট বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি তোলেন। ৭১ বিধিতে দেওয়া মনোযোগ আকর্ষণ নোটিসে তিনি জানতে চান, অন্তর্বর্তী সরকার যেখানে অল্প সময়ে এ প্রক্রিয়া সহজ করতে পেরেছিল, সেখানে বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হলেও তা হয়নি। এ বিষয়ে আর কত সময় লাগবে।
জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় সীমিত দরপত্র পদ্ধতি (এলটিএম) ও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি (ওটিএম)সহ বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি জনগণের স্বার্থে বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আলোচনার অংশ নিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সরকারি দরপত্রে কথিত ‘সিন্ডিকেট’ ও প্রতিযোগিতার বাধা দূর করার জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ও রুলস যুগোপযোগী করার উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, আগের সময়ে আইন ও বিধির আওতায় এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, যার ফলে বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এমন অভিযোগ সরকার শনাক্ত করেছে। তবে এ বিষয়ে রাতারাতি ব্যবস্থা না নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।