স্থিরচিত্রে গতির গল্প

কু-ঝিক-ঝিক চলছে ট্রেন। এক খুদে যাত্রী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে জানালার দিকে কীভাবে বাইরের পৃথিবীটা দুরন্ত বেগে ছুটছে পেছনের দিকে। জানালার ঠিক ওপাশেই গাছপালা, ঘরবাড়ি, মাঠ, মানুষ সব ঝাপসা হয়ে মিশে যাচ্ছে একে অন্যের সঙ্গে, অথচ ট্রেনের ভেতরে মানুষগুলো দিব্যি স্থির! বাল্যকালে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখা গতি আর স্থিতির এই রহস্যময় লুকোচুরি আমাদের চেনা আমরাই ছুটে চলি, পৃথিবীকে পেছনে ফেলে। গতিশীল কিছুর বিপরীতে চারপাশের চেনা জগৎ যখন এভাবে তার পরিচিত রূপ হারিয়ে মায়াময় রেখায় পরিণত হয়, তখনই জন্ম নেয় গতির এক নতুন ভাষা, আলোকচিত্রে যার পরিচয় ‘প্যানিং’ হিসেবে।

পৃথিবী চলমান। চলমান প্রতিটি মুহূর্ত। এভাবে চলতে থাকা পৃথিবীকে ফটোগ্রাফি থামিয়ে দেয় স্থির ফ্রেমে, কিন্তু প্যানিং সেই স্থির ছবিতেও জাগিয়ে তোলে গতির স্পন্দন। এটি আসলে চলমান পৃথিবীর সঙ্গে ক্যামেরার এক নীরব যুগলবন্দি। প্যানিং ফটোগ্রাফির এমন একটি কৌশল, যেখানে চলমান বিষয়বস্তুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্যামেরাও এগিয়ে চলে। ফলে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট থাকে, আর পেছনের পৃথিবী রঙ ও রেখার আঁচড়ে ঝাপসা হয়ে যায়। মনে হয়, অদৃশ্য কোনো শিল্পী তার তুলির টানে সমস্ত স্থিরতাকে মুছে দিয়ে এঁকে চলেছেন এক দুরন্ত ক্যানভাস। সেই ঝাপসা হওয়াটা কোনো ভুল নয়; বরং অস্পষ্টতার সেই মায়াবি আবরণের মধ্যেই দর্শক অনুভব করেন গতি।

এই মায়া আসলে ধীর শাটার স্পিডের যাদু। সাধারণত ১/১৫ থেকে ১/১২৫ সেকেন্ডের সেই ক্ষণস্থায়ী আলোছায়ার খেলায় শাটার চাপার মুহূর্ত থেকে কিছু সময় পর্যন্ত বিষয়বস্তুর গতিপথ বুঝে ক্যামেরাকেও সরিয়ে নিতে হয় একই ছন্দে। এই ছন্দটুকুই প্যানিংয়ের প্রাণ, আলোকচিত্রের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘ফলো থ্রু’। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কন্টিনিউয়াস অটোফোকাস (অঋ-ঈ) মোড হতে পারে এক অতন্দ্র প্রহরী, যা ‘আঁকড়ে ধরে রাখে’ বিষয়বস্তুকে। দিনের চড়া আলোয় এই ধীর শাটারের মায়া তৈরি করতে কখনো কখনো ক্যামেরার চোখে পরাতে হয় এনডি ফিল্টারের চশমা। কিন্তু এসব আয়োজনের বাইরেও রয়েছে এক সূক্ষ্ম বোঝাপড়া বিষয়ের গতি অনুভব করা, তার ছন্দের সঙ্গে নিজের হাতকে মিলিয়ে নেওয়া। প্যানিংয়ে ক্যামেরা চালানোর চেয়ে যেন বেশি জরুরি হয়ে ওঠে গতির সঙ্গে একাত্ম হওয়া। অনুশীলনই সেখানে বড় শিক্ষক। প্রথম ১০টি ছবির ৯টিই হয়তো ব্যর্থ হবে। কিন্তু এই প্রতিটি ব্যর্থ ফ্রেমই এক একটি পাঠ, যা আলোকচিত্রীর চোখকে আরও সচেতন করে, হাতকে আরও স্থির করে, অনুভূতিকে করে আরও পরিণত।

একজন আলোকচিত্রী হিসেবে সেই অনুভূতির কিছুটা পরিণতি এসেছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরে গিয়ে। শীতের আমেজে মাঠের ধান কাটা শেষ; বসেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের মেলা, যার মূল আকর্ষণ ধূলি ওড়ানো ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। চারদিকে উৎসবের শোরগোল, ছোট-বড় সওয়ারিদের চোখেমুখে উত্তেজনা। ঘোড়ার খুরে খুরে যেন মাটিও অস্থির। অথচ ক্যামেরায় দৃশ্যগুলো ধরতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, কোথায় যেন ছন্দের অভাব। ঘোড়ার গতি ধরা পড়ছে ঠিকই, কিন্তু গতির উন্মাদনা নয়। স্থির ফ্রেমে দৃশ্য বন্দি হচ্ছে, অথচ দৃশ্যের প্রাণটুকু অধরাই থেকে যাচ্ছে।

শেষ বিকেলের আলো কিছুটা নরম হয়ে এলে ভাবলাম, এবার ক্যামেরাকে ছুটতে দিতে হবে ঘোড়ার সঙ্গে। শুরু হলো প্যানিংয়ের চেষ্টা। একের পর এক ফ্রেম কখনো ঘোড়া ঝাপসা, কখনো সওয়ারি ফ্রেমের বাইরে, কখনো পটভূমি নিস্তরঙ্গ। প্রত্যাশা আর ব্যর্থতার সেই দোলাচলের মধ্যে হঠাৎ এক মুহূর্তে হাত ও ক্যামেরা মিলে গেল ঘোড়ার গতির সঙ্গে। জন্ম নিল কাক্সিক্ষত ছবিটি।

সাদাকালো ফ্রেমটিতে কিশোর সওয়ারি ও ঘোড়া যেন গতির বুকেও স্থিরতার এক আশ্চর্য নোঙর। সওয়ারির একাগ্র মুখ, ঘোড়ার টানটান শরীর সবকিছু স্পষ্টতার নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে। পেছনে উৎসুক দর্শক আর দিগন্তের অবয়ব মিশে গেছে দীর্ঘ ধূসর রেখায়; মাটির ওপর ধূলা যেন ছুটে চলা সময়ের অস্পষ্ট স্বাক্ষর। সেই রেখাগুলো চোখকে টেনে নিয়ে যায় সামনের দিকে, ঘোড়া ও সওয়ারিকে সঙ্গী করে। ছবিটি যেন আর শুধু দেখার থাকে না, হয়ে ওঠে অনুভব করারও সেখানে যেন শোনা যায় খুরের শব্দ, টের পাওয়া যায় বাতাসের বেগ, অনুভূত হয় তারুণ্যের দুরন্ত উচ্ছ্বাস। প্যানিংয়ের নান্দনিকতা শুধু গতিতে নয়, অনুভূতিতেও।

প্যানিংয়ের ফ্রেমে পৃথিবী ছুটে চলে, পটভূমি হারায় তার পরিচিত অবয়ব; শুধু একটি মুহূর্ত গতির বুক চিরে হয়ে ওঠে স্থির। এটি গতি ও স্থিতির মধ্যে লেখা এক গল্প, যা মনে করিয়ে দেয় সব সৌন্দর্য নিখুঁত স্পষ্টতায় ধরা পড়ে না। কখনো কখনো চারপাশের চেনা কোলাহলকে ইচ্ছে করেই ঝাপসা করে দিতে হয়, যাতে মূল গল্পটি হয়ে ওঠে আরও মূর্ত, আরও অর্থবহ। ফটোগ্রাফির ভাষায় এটি একটি কৌশল; জীবনের ভাষায়, হয়তো, একটি দর্শন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোকে থামিয়ে নয়, তাদের ছন্দে ছুটেই আপন করে নিতে হয়।

লেখক : আলোকচিত্রী ও ব্যাংক কর্মকর্তা