৮০ শতাংশ হোটেল কক্ষ বুকড

দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি রয়েছে। এই ছুটির দিনগুলোয় পরিবার-পরিজনসহ বেড়াতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে হোটেল-মোটেল অগ্রিম বুকিং দিয়ে রাখছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ইতিমধ্যে কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কুয়াকাটা, সিলেট ও সুন্দরবনঘেঁষা হোটেল-মোটেলগুলোতে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ছুটির প্রধান দিনগুলোয় সব কক্ষই বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের সম্ভাব্য চাপ সামাল দিতে আবাসন, পরিবহন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রস্তুত রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে পর্যটকদের চাহিদা বিবেচনায় আগামী ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার রুটে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

কুয়াকাটার ট্যুর অপারেটস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটার (টোয়াক) প্রেসিডেন্ট রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ইতিমধ্যে কুয়াকাটার প্রায় ৮০ শতাংশ হোটেলকক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। কুয়াকাটায় ছোট-বড় ৩০০টির বেশি আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। এগুলোতে প্রায় ৪০-৫০ হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া ছুটিতে বাড়তি পর্যটকের চাপ সামাল দিতে আশপাশের পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ বাসাবাড়ি হোমস্টে হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সুলাইমান বিশ্বাস বলেন, দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে এবার দীর্ঘ ছুটি পাচ্ছেন পর্যটকরা। তাদের স্বাগত জানাতে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটননির্ভর প্রায় ১৬টি পেশার পাঁচ-সাত হাজারের বেশি শ্রমিক প্রস্তুত রয়েছেন। আমাদের শতাধিক প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড প্রস্তুত পাশাপাশি অন্য সেক্টর থেকেও আরও দুইশতাধিক শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। হোটেল বেস্ট সাউদার্নের পরিচালক জনি বলেন, ১৬-২৪ তারিখ পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। এখনো অনেকেই ফোন করছেন, কিন্তু দিতে পারছি না। হোটেল সাউথ স্টারের পরিচালক মো. মিঠুন তালুকদার বলেন, আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির হোটেল। কক্ষ ২২টি কক্ষের মধ্যে গড়ে ৭০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে।

দুর্গাপূজা ও সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ২০-২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ছুটি পাচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দীর্ঘ এ ছুটিতে অনেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফিন্যান্স সেক্রেটারি ও হোটেল খান প্যালেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খান মো. রাসেল বলেন, কুয়াকাটায় বছরে সবচেয়ে বেশি পর্যটক যে সময়গুলোতে হয়ে থাকে, তার এই পূজার সয়য়টা অন্যতম। তাই যারা এ সময়ে কুযাকাটাতে আসবেন, তাদের নিরাপত্তা ও সঠিকভাবে ভ্রমণে আমরা শতভাগ সহযোগিতা ও ব্যবস্থা করব।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ নাজমুল আহসান বলেন, লম্বা ছুটি কেন্দ্র করে কুয়াকাটায় পর্যটকের বাড়তি চাপ সামলাতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ সম্মিলিতভাবে বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গলে পথের ভোগান্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পর্যটন ব্যবসায়ীরা : দুর্গাপূজার ছুটিতে সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, বনাঞ্চল ও লেকের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে প্রতি বছরই ছুটির সময়ে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। এবারও পূজা ও সাপ্তাহিক ছুটিসহ পাঁচ দিনের ছুটিতে পর্যটকদের ভালো সমাগমের আশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অবস্থা ও ট্রেনের টিকিটের স্বল্পতা পর্যটনের জন্য প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছেন তারা।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, পূজার ছুটির প্রথম তিন দিনের জন্য শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে ভালো বুকিং রয়েছে। রিসোর্টগুলোতে অগ্রিম বুকিংয়ের হার প্রায় ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ছুটির বাকি দিনগুলোতেও বুকিং বাড়বে বলে আশা করছেন তরা। তবে সড়ক ও রেল যোগাযোগের ভোগান্তি কমানো না গেলে সম্ভাবনাময় এই পর্যটন মৌসুমে প্রত্যাশিত পর্যটক সমাগম ব্যাহত হতে পারে। শ্রীমঙ্গল লেমন গার্ডেন রিসোর্টের অপারেশন ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত পূজার ছুটির প্রথম তিন দিনের জন্য ভালো বুকিং রয়েছে। আমরা আশা করছি, পাঁচ দিনের ছুটিতে পর্যটকদের চাপ থাকবে। শ্রীমঙ্গলের অন্যতম আকর্ষণ বিস্তীর্ণ চা-বাগান। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা-গাছ, আঁকাবাঁকা পথ আর সবুজ প্রকৃতি পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পাশাপাশি কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, মাধবপুর লেকের নৈসর্গিক সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে অবকাশ কাটাতে অনেকেই বেছে নেন এই অঞ্চলকে।

শ্রীমঙ্গল ট্যুর অপারেটর অ্যান্ড ট্য্যর গাইড অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম বলেন, ‘পূজার ছুটির দিনগুলোতে এখন পর্যন্ত মোটামুটি বুকিং পেয়েছি। তবে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা পর্যটন খাতের জন্য একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সাধারণ সম্পাদক এস কে দাশ সুমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাঁচ দিনের ছুটি থাকলেও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নাজুক অবস্থা এবং ট্রেনের টিকিটের স্বল্পতার কারণে অনেক পর্যটক শ্রীমঙ্গলে আসতে চান না। তবে যানজট না হলে এবার শ্রীমঙ্গলে ভালো পর্যটক সমাগম হবে বলে আশা করছি।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূজার ছুটির প্রথম তিন দিনের জন্য এখন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের হোটেল-রিসোর্টে প্রায় ৭৫ শতাংশ বুকিং রয়েছে। আশা করছি, আগামী দুই দিনে বুকিং আরও বাড়বে এবং ভালো পর্যটক সমাগম হবে।’

শ্রীমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন চা-বাগান, বধ্যভূমি-৭১, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন,   বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, রাবার বাগান, বাইক্কা বিল, চম্পা লেক, সাত রঙের চা, লাল পাহাড়, খাসিয়াপল্লী ও মণিপুরীপাড়া। এ ছাড়া পাশের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, হামহাম জলপ্রপাত এবং বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধেও পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

কক্সবাজারে ৫ লাখ পর্যটকের প্রত্যাশা : টানা পাঁচ দিনের সরকারি ছুটিতে কক্সবাজারে বসবে লাখো পর্যটকদের মিলনমেলা। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সবুজ পাহাড়, রুপালি বালু, নীল সমুদ্র আর সফেদ ঢেউয়ে মন হারাতে প্রতিবারের মতো এবারও প্রতিদিন লাখো দেশীয় পর্যটক আসবেন। জানা গেছে, ইতিমধ্যে হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। এ জন্য ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার রুটে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, আমরা আশা করছি, প্রতিদিন গড়ে এক লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন। সে হিসাবে পাঁচ দিনে পাঁচ লক্ষাধিক পর্যটকের সমাগম হতে পারে। অনেক হোটেলে প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। তিনি বলেন, পর্যটক মৌসুম না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা লস গুনছিল। কিন্তু এই বন্ধ আমাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আশা করছি, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহ বলেন, এখন অফ সিজন থাকায় নিয়মিত অতিথি মিলছিল না। তবে আশা করছি, টানা পাঁচ দিনের ছুটির কারণে চার দিন কক্সবাজার পর্যটকে ভরপুর থাকবে।  এদিকে টানা ছুটিতে পর্যটক ও যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা স্পেশাল’ দুপুর আড়াইটায় ছেড়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ঢাকায় পৌঁছাবে। একই দিন ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ রাত সাড়ে ১০টায় ছেড়ে পর দিন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজার পৌঁছাবে। ২৩ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বিশেষ ট্রেন বেলা সাড়ে ১১টায় ছেড়ে রাত ৮টায় ঢাকায় পৌঁছাবে। একই দিন ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ রাত সাড়ে ১০টায় ছেড়ে পর দিন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছাবে।

এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ বেলা সাড়ে ১১টায় ছেড়ে রাত ৮টায় ঢাকায় পৌঁছাবে। একই দিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘চট্টগ্রাম স্পেশাল’ রাত সাড়ে ১০টায় ছেড়ে পর দিন ভোর ৪টায় চট্টগ্রামে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন বলেন, টানা ছুটিতে কক্সবাজারগামী যাত্রীর চাপ অনেক বেশি থাকে। এ চাপ সামাল দিতেই বিশেষ ট্রেন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকের চাপ বাড়বে। তাদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।