গাজায় ২০২৪ সাল থেকে অনাহার ও অপুষ্টিতে অন্তত ৪৬৬ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫৭ জনই শিশু। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
বিশ্ব খাদ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ওই পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, মৃতদের মধ্যে অন্তত ১৮৯ জন প্রবীণ, যা মোট মৃত্যুর ৪০.৫ শতাংশ। খাদ্যসংকটের ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আগামী ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত গাজার ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে রাষ্ট্রসংঘ গাজায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও অবরোধের মধ্যে খাদ্য ও ত্রাণ সরবরাহে বিধিনিষেধের কারণে পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনি সরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সময় ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে সীমান্ত দিয়ে পণ্য ও ত্রাণ প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ আরও কঠোর করে ইসরায়েল। এর ফলে সীমান্তে অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় ঢুকতে পারেনি।
অবরোধ ও খাদ্য সরবরাহে বাধার কারণে উত্তর গাজার বহু মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়েন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তাঁদের কেউ কেউ পশুখাদ্য ও বুনো গাছপালা খেতে বাধ্য হন।
গাজার সরকারি মিডিয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৮১ দিন পর ২০২৫ সালের মে মাসের শেষ দিকে প্রথমবারের মতো ৮৭টি ত্রাণবাহী ট্রাককে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপরও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে সীমিত ও অনিয়মিতভাবে ত্রাণ প্রবেশ করেছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ফেব্রুয়ারিতে ট্রাক প্রবেশের সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা।
গাজার সরকারি মিডিয়া দপ্তরের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী যতগুলি মানবিক সহায়তাবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা ছিল, তার মাত্র ৩৪ শতাংশ গাজায় ঢুকতে পেরেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বক্তব্য, প্রবেশ করা ত্রাণের মধ্যেও অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যসামগ্রীর পরিমাণ পর্যাপ্ত নয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির ১ লাখ ৫৮ হাজারেরও বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ১৮ শতাংশের অবস্থা এতটাই গুরুতর যে তা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ ছাড়া ১২.২ শতাংশ শিশু বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার সমস্যায় ভুগছে, যা দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির প্রভাব নির্দেশ করে।
মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কমবয়সি শিশুদের মৃত্যুহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২২ সালে প্রতি এক হাজার জীবিত জন্মে যেখানে ১৩.৬টি শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটত, ২০২৫ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৪-এ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমান, ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গাজায় প্রায় ৭৪ হাজার ২০০ শিশুর তীব্র অপুষ্টির চিকিৎসার প্রয়োজন হবে।
খাদ্যসংকটের প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুদের উপরও। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে রক্তাল্পতার হার ছিল ৪১ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ শতাংশে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে প্রায় ৪ হাজার গর্ভপাত বা গর্ভস্থ সন্তান হারানোর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের ছয় মাসের তুলনায় এই সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি। বর্তমানে গাজার প্রতি তিনটি গর্ভধারণের মধ্যে একটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য, খাদ্যসংকটের স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখন শুধু শিশুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং মা ও গর্ভস্থ সন্তানদের জীবনও ক্রমশ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যুদ্ধের সময়েও খাদ্য পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অবিলম্বে পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে তারা।
মন্ত্রণালয়ের আবেদন, গাজায় খাদ্যসামগ্রী, অপুষ্টির চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিশেষ পুষ্টি-সহায়ক উপকরণ এবং ওষুধের নিরাপদ, ধারাবাহিক ও বাধাহীন প্রবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অপুষ্টির ঝুঁকিতে থাকা শিশু, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারী এবং প্রবীণদের ত্রাণ বণ্টনে অগ্রাধিকার দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি খাদ্যসংকট মোকাবিলায় স্থানীয় কৃষি উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার জন্য সহায়তার দাবি জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষিজমি, খাদ্য উৎপাদনকেন্দ্র এবং পানীয় জলের নেটওয়ার্কের ক্ষতির ফলে স্থানীয়ভাবে মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর সক্ষমতাও কমেছে।
বারবার বাস্তুচ্যুতি, আয়ের উৎস হারানো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবারগুলির পক্ষে নিজেদের খাদ্যের জোগান দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু ত্রাণ প্রবেশের অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে বহু মানুষ এখনও পর্যাপ্ত খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।