১৫ বছরে কর্মসংস্থান হারাবে ৮০ কোটি তরুণ, আশঙ্কা জাতিসংঘের

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৩ পিএম

আগামী ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলির শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে চলেছেন প্রায় ১২০ কোটি তরুণ। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে তাঁদের মধ্যে ৮০ কোটি তরুণের জন্য কোনও কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে না। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এমনই আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-র প্রশাসক আলেকজান্ডার ডি ক্রু। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে দুটি নতুন উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। খবর জাতিসংঘের সংবাদমাধ্যম ইউএন নিউজ। 

ব্যাংকক থেকে নিউ ইয়র্কে এক সাংবাদিক বৈঠকে ডি ক্রু বলেন, আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ পড়াশোনা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বাকি ৮০ কোটি তরুণের জন্য কাজের সুযোগ থাকবে না।

বিশ্বব্যাঙ্ক গোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের (আইএমএফ) বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে বর্তমানে ব্যাংককে রয়েছেন ইউএনডিপি প্রধান। তাঁর মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলির জনসংখ্যাগত পরিস্থিতিই এই সংকটের অন্যতম কারণ। বহু দেশে মানুষের মধ্যম বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ফলে বিপুল সংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ক্রমশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

ডি ক্রু বলেন, এই পূর্বাভাস বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিজে থেকেই বদলে যাবে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। তাঁর কথায়, 'এই পরিস্থিতির জন্য নীতিগত সিদ্ধান্তও দায়ী।'

কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় ইউএনডিপি দুটি উদ্যোগ চালু করেছে। 'ইনভেস্টমেন্ট অ্যাক্সিলারেটর' নামের প্রথম উদ্যোগের লক্ষ্য, বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও আইনি কাঠামো তৈরিতে সরকারগুলিকে সহায়তা করা। পাশাপাশি বিনিয়োগের উপযোগী প্রকল্প চিহ্নিত করা এবং সেগুলিকে পরিকল্পনার স্তর থেকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

দ্বিতীয় উদ্যোগ 'জবস ফর প্রসপারিটি ফ্যাসিলিটি'-র মাধ্যমে যেসব ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বেশি, সেগুলি চিহ্নিত করা হবে। নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে তরুণদের দক্ষতার সামঞ্জস্য তৈরি করা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের পথে বাধা দূর করাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য। 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের প্রভাব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ডি ক্রু জানান, সক্রিয় শ্রমনীতি গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের এই পূর্বাভাস বদলানো সম্ভব। তাঁর মতে, এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও পরিচর্যা পরিষেবা, কৃষি ও পর্যটনের মতো ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, 'মানুষকে দারিদ্র্য থেকে স্থায়ীভাবে বের করে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল কর্মসংস্থান সৃষ্টি।' 

বিশ্বব্যাঙ্ক গোষ্ঠী, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের সহযোগিতায় এই দুটি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যেই নেপাল, ইয়েমেন, হাইতি, লেবানন ও ঘানায় পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

এমন এক সময়ে ইউএনডিপি এই উদ্যোগগুলি ঘোষণা করল, যখন বহু উন্নয়নশীল দেশ একসঙ্গে তিনটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ডি ক্রু এই পরিস্থিতিকে 'তিনমুখী ধাক্কা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ১৯৫০ সালের পর অন্যতম তীব্র এল নিনো পরিস্থিতি এবং ঋণের অত্যন্ত বেশি সুদের হার—এই তিনটি বিষয় উন্নয়নশীল দেশগুলির অর্থনীতির উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

ইউএনডিপির নতুন প্রতিবেদন নো টাইম টু রিকভার অনুযায়ী, বর্তমানে একটি মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশকে সরকারি আয়ের গড়ে ৯.৫ শতাংশ শুধু ঋণের সুদ মেটাতেই ব্যয় করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১০ সালের পর এই প্রথম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এই দারিদ্র্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু আয় নয়, বিদ্যুৎ, পানীয় জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধার প্রাপ্যতাও বিবেচনা করা হয়।

ডি ক্রু বলেন, এই পরিসংখ্যান সকলের জন্যই সতর্কবার্তা হওয়া উচিত।

তাঁর মতে, প্রত্যাশার তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতি এখনও কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও সেই স্থিতিশীলতার সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। কিছু দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ায় তারা নতুন ধাক্কা সামলাতে সক্ষম। কিন্তু অন্য দেশগুলির পক্ষে আরও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত