কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না, ছিল না কৃত্রিম কোনো রঙ ছেটানোর আয়োজন। অথচ প্রকৃতি যেন নিজেই তুলি হাতে তুলে নিয়ে সাজিয়ে দিল এক আর্জেন্টাইন পোস্টকার্ড! পেরুর দুর্গম আন্দিজ পর্বতমালার উঁচুতে আবিষ্কৃত নতুন এক সুগন্ধি ফুলের পাপড়ি মেলতেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন উদ্ভিদবিদরা। শুভ্র তুলোর মতো সাদার বুকে ছড়িয়ে থাকা হালকা আকাশি-সাদা সেই দ্যুতি মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয় ফুটবলের মহাতারকা গাড়ে চড়ানো আলবিসেলেস্তের জার্সি।
এক বিরল আকাশি-সাদা ফুল হয়ে যেন প্রকৃতির ক্যানভাসেই ফিরে এলেন আর্জেন্টিনার এই মহাতারকা। ফুটবল আর বিজ্ঞানের মোহনীয় এক মেলবন্ধনে আন্দিজ পর্বতমালার উঁচুতে খুঁজে পাওয়া নতুন এই সুগন্ধি প্রজাতির উদ্ভিদের নামকরণ করা হয়েছে ‘সালভিয়া মেসি’ (Salvia messii)।
বিশ্বজয়ী অধিনায়কের এই অমলিন মাহাত্ম্য এবং মানুষের আবেগের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে আজারা ফাউন্ডেশন ও মায়মোনাইডস ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্লদিও বের্তোনাত্তি বলেন, ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণা তো মানুষেরই সৃষ্টি। কোনো প্রকৃতিবিদ বা বিজ্ঞানীই লিওনেল মেসির মতো অনন্য ব্যক্তিত্বের তৈরি করা আবেগের পরিমণ্ডলের বাইরে নন। এটিই মূলত প্রমাণ করে, কেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের গবেষকেরা এই শ্রদ্ধার্ঘ্যে এক ছাতার নিচে এসেছেন, যা তাঁর নামকে প্রকৃতিতেও চিরস্মরণীয় করে রাখবে।’
মোবাইল স্ক্রিনের কৌতুহল থেকে পাহাড়ি অভিযান
গল্পের শুরুটা কিন্তু আধুনিক কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটরিতে হয়নি। লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটির পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিদ রোল্যান্ডো উরিয়া একদিন সাধারণ প্রকৃতিপ্রেমীদের তোলা কিছু ছবি মোবাইল স্ক্রিনে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। হঠাৎ পেরুর পার্বত্য অঞ্চলের একটি গুল্মজাতীয় গাছের ছবি দেখে থমকে যান তিনি; কারণ পরিচিত উদ্ভিদবিদ্যার কোনো বইয়ের শ্রেণিবিন্যাসের সাথেই সেটি মিলছিল না।
কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে তিনি যোগাযোগ করেন লিমার ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বোটানিস্ট পল গঞ্জালেস এবং জীববিজ্ঞানী জ্যঁ কাপচা রামোসের সাথে। এরপর শুরু হয় রোমাঞ্চকর এক অভিযান, বছরের পর বছর ধরে আন্দিজের দুর্গম পাহাড়ি ঢাল আর পাথুরে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সন্ধান মেলে দেড় মিটার উঁচু এই বিরল গুল্মের, যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থান পায় প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'ফাইটোতাক্সা'-তে (Phytotaxa)।
আকাশি-সাদা জার্সির রূপক এবং ব্যাকরণের 'আই'
বিজ্ঞানের কঠিন ব্যাকরণে যখন কোনো কিংবদন্তির নামে নামকরণ করা হয়, তখন লাতিন নিয়ম মেনে নামের শেষে যুক্ত হয় একটি বাড়তি 'আই' (i)। সেই সুবাদেই 'মেসি' নামটির রূপ দাঁড়ায় 'মেসিআই' বা 'মেসির উদ্ভিদ'। ল্যামিয়াসি (Lamiaceae) বা পুদিনা-তুলসী পরিবারের এই সুগন্ধি উদ্ভিদের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিকটি হলো এর পাপড়ি। বসন্তে যখন এই ফুল ফোটে, তখন এর হালকা নীলাভ আভা আর শুভ্র সাদার অনবদ্য সংমিশ্রণ দেখে মনে হয়—প্রকৃতি যেন স্বহস্তে বুনে দিয়েছে আলবিসেলেস্তেদের সেই কালজয়ী ১০ নম্বর জার্সি! কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই প্রকৃতির নিজস্ব পোস্টকার্ডে যেন আঁকা হয়ে গেছে এক টুকরো আর্জেন্টিনা।
যেখানে স্পর্শ করেন, সেখানেই ফুটবলে অমরত্ব
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার জন্য জীবজগতে নাম আঁকার ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মাঠের ফুটবলে মেসির পায়ের জাদু যেভাবে ভাসিয়ে নিয়েছে ট্রফি আর রেকর্ড, বিজ্ঞান জগৎও তাকে একইভাবে আপন করে নিয়েছে। এর আগেও আন্দিজের বিলুপ্তজাত শকুন (ভালচার মেসি), পাতাগোনিয়ার বিরল মাকড়সা (আকান্থোগোনাটাস মেসি), বিশেষ ছত্রাক (সেরকোপেমসেস মেসি), প্রাগৈতিহাসিক প্রজাতি (ডিস্কনিস্কা মেসি) কিংবা সালতার টিকটিকির (লিওলায়েমুস মেসি) গায়ে লেগেছে এই আর্জেন্টাইন জাদুকরের নাম।
হুমকির মুখে প্রকৃতির এই বিরল রত্ন
তবে এই রূপকথার মিষ্টি সুবাসের পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন বাস্তবতার সুর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,০০০ থেকে ২,৪০০ মিটার উচ্চতার সীমিত পাহাড়ি এলাকায় বেঁচে থাকা 'সালভিয়া মেসি' জন্মাবস্থাতেই চূড়ান্ত বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। দাবানল, জলবায়ু পরিবর্তন আর বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে এর প্রাকৃতিক বাসস্থান ছোট হয়ে আসায় বিজ্ঞানীরা প্রাথমিক মূল্যায়নেই একে 'ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি' হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছেন। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, মাঠের ফুটবলে যেমন অসংখ্যবার হারতে বসা ম্যাচকে অলৌকিকভাবে জিতিয়ে এনেছেন মেসি, ঠিক তেমনি তার নামের এই আন্তর্জাতিক পরিচিতি বিপন্ন প্রকৃতির এই সুগন্ধি ফুলটিকে বাঁচিয়ে রাখতে পুরো বিশ্বকে সচেতন করবে।