মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও গ্রামে প্রায় তিনশ বছরের ঐতিহ্য ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্যতিক্রমী লাল বর্ণের দুর্গাপূজা। দেশের একমাত্র লাল দুর্গাপ্রতিমা দেখতে প্রতি বছরের মতো এবারও প্রত্যন্ত এই গ্রামে ভিড় করছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) মহাষষ্ঠী এবং শনিবার (১৭ অক্টোবর) মহাসপ্তমী উপলক্ষে পাঁচগাঁও দুর্গামণ্ডপ পরিণত হয় লোকে লোকারণ্য স্থানে।
মণ্ডপ কমিটি ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচগাঁও গ্রামের এই দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় তিনশ বছরের পুরোনো। ১৪১৫ বঙ্গাব্দে গ্রামটিতে নতুন করে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকে লাল বর্ণের প্রতিমা তৈরি করে পূজা শুরু হয়। স্থানীয়দের দাবি, উপমহাদেশের প্রথম এবং বাংলাদেশের একমাত্র লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা এটি। প্রতিবছর মহাষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনে এখানে কয়েক লাখ ভক্তের সমাগম ঘটে।
পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গাপূজা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে একটি কাহিনি। কথিত আছে, আসামের শিবসাগরে মুন্সি পদে চাকরি করতেন সর্বানন্দ দাস নামের এক সাধক। একবার তিনি আসামের কামরূপ-কামাখ্যায় গিয়ে পূজার জন্য পাঁচ বছরের একটি কন্যাশিশু চান। তখন স্থানীয় লোকজন তাকে একটি শিশুকন্যা দেন।
সেই কন্যাশিশুর পূজা করার একপর্যায়ে সাধক লক্ষ করেন, ধীরে ধীরে শিশুটির গায়ের রং লাল হয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় বিস্মিত হয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, শিশুটির মধ্যে স্বয়ং দেবীর আবির্ভাব ঘটেছে। এরপর দেবী তাকে বর চাইতে বললে সর্বানন্দ দাস বর প্রার্থনা করেন। তখন দেবী নির্দেশ দেন, পাঁচগাঁওয়ের দুর্গাপ্রতিমার রং হবে লাল। একই সঙ্গে সাধক দেবীকে রাজনগরের পাঁচগাঁওয়ে আবির্ভূত হওয়ার আকুতি জানান। সেই বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করেই গ্রামটিতে প্রতিবছর লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমার পূজা হয়ে আসছে।
পাঁচগাঁও দুর্গামন্দিরের প্রতিমা তৈরির কারিগর অশোক আচার্য জানান, তার দাদা ও বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিমা তৈরির পেশায় যুক্ত ছিলেন। তাদের ধারাবাহিকতায় তিনিও লাল দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
অশোক আচার্য বলেন, দেশের অন্যান্য দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গা একেবারেই আলাদা। বাংলাদেশে এ ধরনের লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমা আর কোথাও দেখা যায় না। তবে ভারতের আসাম ও কামাখ্যা অঞ্চলে বর্তমানে লাল বর্ণের প্রতিমা রয়েছে। পাঁচগাঁওয়ের এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা দেখতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত আসেন।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সহসম্পাদক সুমন কল্যাণ ভট্টাচার্য বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা রূপ ও রঙের দুর্গাপ্রতিমা এবং দুর্গোৎসব দেখা যায়। তবে লাল বর্ণের দুর্গাপ্রতিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচগাঁওয়ের লাল দুর্গামায়ের মন্দির সারা দেশে অন্যতম জাগ্রত স্থান হিসেবে পরিচিত। প্রতিবছর এখানে বিপুলসংখ্যক ভক্ত সমবেত হন।
বর্তমানে পাঁচগাঁও মন্দিরে পূজা পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন সাধক সর্বানন্দ দাসের ষষ্ঠ বংশধর সঞ্জয় দাস। তিনি জানান, এটি তাদের পারিবারিক দুর্গাপূজা। পূর্বপুরুষ সর্বানন্দ দাস ধ্যানে বসে কুমারীপূজার মাধ্যমে লাল দুর্গার দর্শন পাওয়ার পর থেকেই প্রতিবছর এখানে এই পূজা হয়ে আসছে।
সঞ্জয় দাস আরও জানান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার প্রতিমা নির্মাণ করে পূজার আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। সে বছর ঘটপূজার মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়েছিল।
মৌলভীবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় মোট ১ হাজার ২২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে ৮৯৮টি সর্বজনীন এবং ১২৪টি ব্যক্তিগত পূজামণ্ডপ।