দীর্ঘ ২৫ বছরের ময়লার ভাগাড় ও দুর্গন্ধময় পরিবেশের অবসান ঘটেছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের আমিনবাজার-হেমায়েতপুর অংশে। বর্জ্যের স্তূপ সরিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে সবুজের সমারোহ। রোপণ করা হয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির সাড়ে ছয় হাজারের বেশি গাছ। রাতের সৌন্দর্য বাড়াতে স্থাপন করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন। ‘সফল রূপান্তর’ নামের এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে আগামীকাল রবিবার (১৮ অক্টোবর) সাভারে আসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্পটি ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবাদী সংগঠন ও মহাসড়কে চলাচলকারী মানুষের মধ্যে সন্তোষ দেখা গেছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানিয়েছেন, আগামীকাল রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্প এলাকায় একটি নিমগাছের চারা রোপণ করবেন। এর আগে তিনি সাভার সেনানিবাসের নবম পদাতিক ডিভিশনের একটি কর্মসূচিতে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে উৎসাহ-উদ্দীপনা।
রাজধানী ঢাকায় প্রবেশের অন্যতম পথ আমিনবাজারে দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কের পাশে জমে ছিল ময়লা-আবর্জনা। দুর্গন্ধের কারণে পথচারী ও যাত্রীদের চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হতো। সেই চিত্র বদলে এখন সেখানে শোভা পাচ্ছে সারি সারি গাছ, বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও সবুজ ঘাস। মাটির ঢালে লাগানো হয়েছে ঘাস। জায়গাটির সুরক্ষায় দেওয়া হয়েছে নেটের বেড়া। পাশাপাশি রাখা হয়েছে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, গত ৭ জুলাই মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন মহড়ার অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে আমিনবাজারের বিশাল ময়লার ভাগাড় প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। পরে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। এলাকাটি ঢাকা সিটি করপোরেশন ও সাভার পৌরসভার বাইরে সাভার উপজেলার মধ্যে হওয়ায় ঢাকা জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেয়।
জেলা প্রশাসকের তদারকিতে ময়লা অপসারণের পর বালু দিয়ে জায়গাটি ভরাট করা হয়। এরপর রাস্তার পাশের অংশে গাছ লাগানো এবং সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়। ভবিষ্যতে যাতে কেউ সেখানে বর্জ্য ফেলতে না পারে, সে জন্য দেওয়া হয়েছে ফেন্সিং নেট। পাশাপাশি মাটি ধসে পড়া ঠেকাতে নির্মাণ করা হয়েছে রিটেইনিং ওয়াল।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সেখানে নিম, সুপারি, তাল, মাধবীলতা, সিজিয়াম, ঝাউ ও রঙ্গনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার উইন্ডমিল ও সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল।
ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম জানান, আমিনবাজার থেকে হেমায়েতপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মহাসড়কের পাশে এ পর্যন্ত মোট ছয় হাজার ৯৩০টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুপারি গাছ তিন হাজার ৮১৫টি, নিমগাছ এক হাজার ২৭০টি এবং তালগাছ ৬০টি। বাকি গাছের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও শোভাবর্ধক গাছ।
তিনি আরও জানান, রাতে সবুজের সমারোহ আলোকিত রাখতে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল ও উইন্ড টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো থেকে দৈনিক তিন কিলোওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে রাতে ১২০টি বাতি জ্বালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। গাছপালার পরিচর্যার জন্য রাখা হয়েছে একজন মালি। আর রাতের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করবেন তিনজন প্রহরী।
জেলা প্রশাসক বলেন, আগে এই পথ দিয়ে চলাচলের সময় দুর্গন্ধের কারণে মানুষকে নাক চেপে যেতে হতো। এখন সেই ময়লার ভাগাড় বদলে সবুজের নান্দনিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেও এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী যে সবুজ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, সেই লক্ষ্যেই তারা এগিয়ে যেতে চান।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে ঢাকা জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বর্জ্য অপসারণের পর জায়গাটি পরিষ্কার করে ভরাট করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন প্রজাতির গাছ, মাধবীলতা ও ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। মাটির ঢালেও লাগানো হয়েছে ঘাস। গাছপালার পরিচর্যা ও রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় লোকবল রাখা হয়েছে।
এদিকে তথ্য মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা-২ আসনের সংসদ সদস্য আমান উল্লাহ আমান বলেন, মহাসড়কের পাশে আবর্জনা দেখে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দেশকে সবুজে ছেয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রধানমন্ত্রী নিজে এসে গাছের চারা রোপণ করবেন।
স্থানীয় আমিনবাজার ইউনিয়নের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ সহ্য করে এই পথ দিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। এখন সবুজের সমারোহ দেখে তাঁরা স্বস্তি পাচ্ছেন। এমন পরিবর্তনে তারা খুশি এবং প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।
সাভারের সচেতন মহলও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছে। তাদের মতে, ময়লার ভাগাড়কে সবুজ পরিবেশে রূপান্তর করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
তবে এই পরিবর্তন ধরে রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘদিনের দুর্গন্ধময় পরিবেশ বদলে আমিনবাজার-হেমায়েতপুর অংশে যে সবুজের আয়োজন গড়ে উঠেছে, তা পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সচেতনতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।