প্রদর্শনীতে প্রতিটি শিল্পী দেবী দুর্গাকে নিজের মতো করে ধারণ করেছেন। কারও ছবিতে অস্ত্র প্রতিবাদের ভাষা, কারও রঙে মাতৃত্ব ও মমতা, কারও রেখায় নারীর আত্মবিশ্বাস, আবার কারও কল্পনায় সমকালীন বিশ্বের সংগ্রাম। এই বহুমাত্রিক রূপের মাঝে দেবী দুর্গাকে আপনি কীভাবে উপলব্ধি করেন সেটাই মুখ্য বিষয়। দেবী দুর্গা কেবল একটি পৌরাণিক চরিত্র বা নিছক প্রতিমা নন; দেবী দুর্গা আসলে প্রতিটি মানুষের অন্তরেই বিরাজ করেন। বাহ্যিকভাবে দেবী দুর্গাকে আমরা নারীরূপে আরাধনা করি বটে, তবে এর গভীর অর্থ হলো, তিনি মানবতার শক্তি, মানুষের জাগ্রত আত্মশক্তির প্রতীক। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই কোথাও না কোথাও নিজের ভেতরে এই অমল শক্তিকে অনুভব করতে চান, নিজেকে দুর্গার সংহারী ও সৃষ্টিশীল রূপের অংশ হিসেবে দেখতে চান। আমি আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বাস করি, দেবী দুর্গার দশটি হাত, তার বিশেষ রূপচিত্র, তার বাৎসল্যময়ী মায়া এবং তার অশুভবারক ত্রিনয়ন, এসবের প্রতিটি বিষয়ই মানুষের পরম মঙ্গলের কথা বলে। দুর্গার এই অসীম কল্যাণময় রূপ থেকেই আমরা জীবনের আলোকময় আশিস ও পথনির্দেশনা পেয়ে থাকি।
আমি শুরু থেকেই দুর্গাকে কোনো নির্দিষ্ট সীমায় আবদ্ধ না রেখে পরম মানবতার জায়গা থেকে দেখে এসেছি। আজ আমাদের চারপাশের সমাজে যত অশুভ, অন্ধকার ও অন্যায়ের বিস্তার ঘটছে, আমরা চাই সেগুলোর স্থায়ী অবসান হোক। দুর্গাপূজার মূল চেতনাকে আমি ঠিক সেই বিজয়ের জায়গাতেই দেখতে চাই। আমি চাই, প্রতিটি মানুষের ভেতরের ‘দুর্গা’ বা সুপ্ত বিবেক জেগে উঠুক, যা সমাজের সব অশুভ শক্তিকে এক নিমেষে বিনাশ করবে। মানুষের অন্তরের সেই জাগ্রত শক্তির ছোঁয়ায় যখন সমস্ত অসত্য, অন্যায় ও অশুভ ধ্বংস হবে, তখনই আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হবে এক শাশ্বত সত্য ও সুন্দরের শুভ আগমনী। আর এই সত্য-সুন্দরের ওপর ভিত্তি করেই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, বাসযোগ্য ও সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়ে যেতে পারব, যা বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
বাঙালিদের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, সমাজে ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ারও একটি সুযোগ। মনে করি কারণ আজকের এই জটিল বৈশ্বিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে চোখ মেলালে আমরা দেখতে পাই, পরিবার থেকে শুরু করে আমাদের সমাজ, দেশ এবং সমগ্র পৃথিবী চরম বিভাজনে জর্জরিত। স্বার্থ, ভেদাভেদ ও সংকীর্ণতার দেওয়ালে সবকিছুকে আজ খন্ড--খন্ড এবং টুকরো-টুকরো করে ফেলা হয়েছে। নানা কৃত্রিম ক্যাটাগরি বা শ্রেণিতে ভাগ করে ফেলা হয়েছে মানবজাতি, তাদের মৌলিক অধিকার এবং সর্বোপরি মনুষ্যত্বকে। ঠিক এই বিষন্ন পরিবেশের মাঝে দাঁড়িয়েও দুর্গাপূজার মতো মহৎ সামাজিক উৎসব সব ধরনের মানুষকে এক সুতোয় গাঁথার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে।
পূজার দিনগুলোতে আমরা যা প্রত্যক্ষ করি, তা এক অপূর্ব সম্প্রীতির নিদর্শন। সমস্ত কৃত্রিম বিভেদ ও সংকীর্ণতা ভুলে গিয়ে সব ধর্মের, সব বর্ণ ও শ্রেণির মানুষ একই ছাদের নিচে এসে সমবেত হয়, পারস্পরিক ভালোবাসায় মৈত্রী ও ঐক্যের প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে। এখনো সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যারা সংঘাতহীন এক বৈষম্যহীন পৃথিবী দেখতে চান, তাদের হৃদয়ের গভীরে লালন করেন সম্প্রীতিময় ও ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে। আমাদের দুর্গোৎসব এবং একে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সর্বজনীন মিলনমেলা যেন যুগ যুগ ধরে বারবার সেই মহাসত্যকেই পুনরুক্ত করে, জাতীয়তা ও সম্প্রদায়ের সংকীর্ণতার চেয়ে মানবতা বহু ঊর্ধ্বে। এটিই স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কবি চ-ীদাসের সেই অমর বাণী আজও পরম সত্য ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
লেখক : চিত্রশিল্পী ও ফ্যাশন ডিজাইনার