দুর্গাপূজার শিল্প ও সাংস্কৃতিক দিক

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০১ এএম

দুর্গাপূজার সাংস্কৃতিক দিক নিয়েই যেহেতু আলোচনা, গোড়াতেই উল্লিখিত হওয়া উচিত পূজার দুটি দিক এক ধর্মীয়, দুই সর্বজনীন উৎসব। পূজা শব্দের আভিধানিক অর্থ আরাধনা, উপাসনা, অর্চনা, শ্রদ্ধা বা সম্মান প্রদর্শন। পূজা মূলত স্ত্রীবাচক সংস্কৃত শব্দ। সনাতন ধর্মে দেব-দেবীর প্রতি ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আরাধনা বোঝাতে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। এটি একান্তই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিষয়। কিন্তু উৎসব সর্বজনীন। এর সঙ্গে শিল্প, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যুক্ত রয়েছে। এখানে কোনো ধর্মীয় সীমারেখা নেই। ঐতিহ্য আমাদের সামনে এই নজির রেখেছে। প্রথমেই ইউনেস্কোর স্বীকৃতির কথা তুলে ধরা যাক। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ১৬তম অধিবেশনে ইউনেস্কো দুর্গাপূজাকে মানবজাতির ‘আবহমান অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মূলত কলকাতার দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দিলেও, যেহেতু আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অঞ্চলে দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আমরা ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতিকে সামগ্রিক অর্থেই বিবেচনা করে বলতে পারি, বাংলাদেশে সূচিত দুর্গাপূজাই ইউনেস্কোর শিল্প ও ঐতিহ্যবাহী উৎসবের তালিকাভুক্ত হয়েছে। দুর্গাপূজাকে খ-িতভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। ইউনেস্কো দুর্গাপূজাকে কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবে নয়, বরং শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন এবং সর্বজনীন সম্প্রীতির চমৎকার নিদর্শন হিসেবেই দেখেছে। এশিয়া মহাদেশের কোনো ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দুর্গাপূজাই সম্মানিত হলো। ইউনেস্কোর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দুর্গাপূজা ধর্ম ও শিল্পের সর্বজনীন উদাহরণ, যা শিল্পীদের একটি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রও বটে। অনুষ্ঠানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমাগম ঘটে।

ইউনেস্কোর বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দশ দিনব্যাপী উৎসবের আসল টান ‘ঘরে ফেরা’। শুধু দশ দিনের উৎসবই নয়, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই উৎসবমুখর থাকে বাঙালি। মাটির প্রতিমা গড়া থেকে যে কাজ শুরু হয়ে যায়। প্রতিমা তৈরির পর তা সাজিয়ে গুছিয়ে বিভিন্ন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে এবং বাড়িতে পূজার্চনায় মেতে ওঠেন সবাই। ‘মেয়ের ঘরে ফেরার’ উৎসব হিসেবেই ধুমধাম করে, যা অনুষ্ঠিত হয়। মহালয়া থেকে পূজা শুরুর পর দশমীর দিনে মেয়েকে বিদায় জানানো হয় প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে। নতুন জামা, সাজপোশাক, খাওয়া-দাওয়া, সব মিলিয়ে ধর্ম ও শিল্প-সংস্কৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। পূজার উৎসব ক্রমে স্থান পেয়েছে অনুভূতির অঙ্গ হিসেবে। উৎসবের আলোকচ্ছটায় ধুয়ে-মুছে যায় যাবতীয় ভেদাভেদ। বঙ্গ সংস্কৃতির অনন্য অঙ্গ এই উৎসব। ইউনেস্কোর বিবৃতিতে ধর্ম ও শিল্প-সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কথা উঠে এসেছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মহালয়া ও দেবীপক্ষের সূচনা, ষষ্ঠী থেকে দশমী নানা উপাচারে পূজা, অঞ্জলি ও আরতির মাধ্যমে দেবীর আরাধনা সম্পন্ন হয়। দুর্গাপূজা এমন এক পূজা, যেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয়। শিল্প ও নান্দনিক দিক আলোচনা করলে প্রথমেই আসে প্রতিমা শিল্পের কথা। প্রতিমা শিল্পীরা (ব্যাপক অর্থে মৃৎশিল্পীরা) মাটি, খড়, বাঁশসহ নানা উপকরণে নিখুঁত দক্ষতায় দেবী দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, মহিষাসুর ও তাদের বাহনদের প্রতিমা তৈরি করেন।

এখানে তাদের শিল্পচর্চা নানাভাবে বিকশিত হয়। নানা ধারা তৈরি হয়। ম-প ও আলোকসজ্জায় যারা কাজ করেন তাদেরও নতুন চিন্তার সুযোগ থাকে, তারা বাঁশ, কাপড় এবং নানা উপাদানে থিমভিত্তিক কিংবা ঐতিহ্যবাহী ম-প তৈরি করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিক আলোকসজ্জা। এখন নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে চিন্তার ব্যাপক ব্যাপ্তি ঘটেছে। একটি দুর্গাপূজার আয়োজনকে নান্দনিক রূপ দিতে ঢাকিদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শারদোৎসবকে কেন্দ্র করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে শৈল্পিক দিকগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। নানা পেশাজীবীর উপস্থিতি আমরা পূজায় লক্ষ্য করি। সাংস্কৃতিক ও লৌকিক আঙ্গিকে রয়েছে নাটক, নাচ, গান ও নানা প্রতিযোগিতার আয়োজন। লোকসংস্কৃতির প্রত্যেক ধারায় শিল্পীরা কাজ করার সুযোগ পান বিশেষ করে গ্রামবাংলায়। শহরের আধুনিকতাও অবশ্য ছুটে আসছে দ্রুতগতিতে। সব সম্প্রদায়ের মানুষ অনুষ্ঠানমালায় অংশগ্রহণ করেন। এক সময় পূজার তিন দিনে যাত্রাপালা আবশ্যকীয় অঙ্গ ছিল। আরতির সময় ঢাকের তালে তালে জ¦লন্ত ধুনুচি হাতে নিয়ে ঐতিহ্যবাহী নাচ এখনো উৎসব মাতিয়ে রাখে। শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে কেন্দ্রীয় পূজা ম-পে আরতি প্রতিযোগিতায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষও অংশ নিয়েছেন। শীর্ষস্থানও অধিকার করেছেন।

ইউনেস্কোর ভাষ্যটি পাঠকদের সঙ্গে হুবহু ভাগ করে নিলে দুর্গাপূজার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। দুর্গাপূজা সম্পর্কে ইউনেস্কো বলছে, ‘দুর্গাপূজা হলো ধর্ম ও শিল্পের সর্বজনীন অনুষ্ঠানের সর্বোত্তম উদাহরণ এবং শিল্পী ও নকশাকারীদের জন্য একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র। এই উৎসব পৌর অঞ্চলে বৃহৎ স্থাপনা ও মন্ডপের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী ঢাকের বাদ্য ও দেবীর পূজা দ্বারা পরিচিত। এই উৎসবে শ্রেণি, ধর্ম ও জাতি ভেদাভেদ মুছে যায়।’ ধর্মীয় উৎসব  যেখানে শ্রেণি, ধর্মের ভেদ ভুলে যেতে সহায়তা করে সে উৎসবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ভিন্ন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দুর্গাপূজা আজ শুধু ঢাকা-কলকাতাকেন্দ্রিক নয়। পৃথিবী নামক গ্রামটি ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে যাওয়ার কারণে এই ভূ-গ্রামের সব কোণে, বাঙালি হিন্দুরা ছড়িয়ে পড়েছে। বাঙালি হিন্দুরা যেখানেই বসতি স্থাপন করেছে সেখানেই দুর্গাপূজা সামর্থ্য অনুযায়ী জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে। প্রযুক্তির কল্যাণে বিশ্বের সব স্থানে অনুষ্ঠিত পূজা আজ ভার্চুয়ালি সব মানুষই উপভোগ করতে পারেন। বাঙালি হিন্দুরা অন্যায়, অবিচার, অসত্য থেকে দূরে থাকার জন্য মনের ও জগতের অসুর যাতে বিনাশ লাভ করে, এই উদ্দেশ্যে নানারকম প্রার্থনা করে দুর্গাপূজার আয়োজন করে থাকেন। দেবী দুর্গাকে কেন্দ্র করে এই পূজা প্রাথমিকভাবে সনাতন ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ আচার হলেও, কালের বিবর্তনে এটি বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

 লেখক : সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত