লালন স্মরণোৎসব শুরু

কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসবের উদ্বোধন হয়েছে। ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ লালনের এই বাণী ধারণ করে মানবতার শিক্ষা ও সত্যের সন্ধানে ভক্তরা আখড়াবাড়িতে আসছেন। প্রচলিত প্রথা ও সাধু রীতি অনুসারে তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। গতকাল শনিবার সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া একদিন ‘লালন নগরী’ হবে বলে মন্তব্য করে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটবে। গড়াই-মধুমতী নদীতে আবার নৌকা চলবে। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. রশিদুল নবী। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমিন, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। আলোচনা শেষে মূলমঞ্চে একাডেমির শিল্পী ও দেশবরেণ্য লালন শিল্পীরা লালন ফকিরের আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করেন। 

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এবং কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসব ঘিরে ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে জড়ো হয়েছেন দেশ-বিদেশের সাধু-গুরু, বাউল ও ভক্তরা। আখড়াবাড়ি পরিণত হয়েছে তাদের মিলনমেলায়। উৎসব শেষ হবে আগামী সোমবার রাতে।

উল্লেখ্য, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক সাধক পুরুষ বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মৃত্যুর পর প্রথমে তার অনুসারীরা পরে লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসন প্রতি বছর এই তিরোধান দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে।

সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) : এদিকে সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে গতকাল শনিবার সকালে শুরু হয়েছে আট দিনব্যাপী লালন কারুমেলা। মরমী সাধক লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এ মেলার আয়োজন করেছে।

ফাউন্ডেশনের ক্যাফেটেরিয়ায় আয়োজিত এ কারুমেলায়  ঐতিহ্যবাহী নকশিকাঁথা, কাঠের চিত্রিত হাতি, ঘোড়া ও পুতুল, কারুশিল্প, হাতপাখা, বেতশিল্প, মাটির গহনা, ঝিনুক শিল্প, শতরঞ্জি, মণিপুরি তাঁতশিল্প, কুমিল্লার খাদিশিল্প, একতারা শিল্প ও তাঁতবস্ত্র শিল্পসহ মোট ১৫ জন কারুশিল্পী তাদের নিজস্ব তৈরি পণ্যসামগ্রী নিয়ে অংশ নিয়েছেন। ফাউন্ডেশনে আগত দর্শনার্থীরা মেলায় কারুপণ্য তৈরি প্রক্রিয়া সরাসরি দেখার পাশাপাশি এখান থেকে পছন্দের কারুপণ্য্য কিনতে পারবেন।

লালন কারুমেলা প্রতিদিন সকাল ১০ থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। চলবে আগামী ২৪ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত।

বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় লোকজ ঐতিহ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা, প্রদর্শন, পুনরুজ্জীবন ও কারুশিল্পীদের উন্নয়ন কল্পে এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ।

কুমিল্লা : জাত-পাতের বিভেদ নয়, মানুষের পরিচয় হোক মানবতায়বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের গানে ও দর্শনে উঠে এসেছে এই চিরন্তন বার্তা। সেই মানবতাবাদী দর্শনকে ধারণ করে কুমিল্লায় পালিত হয়েছে লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। এ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

গতকাল শনিবার বিকেলে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গান ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে, লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এ নজরে’।

জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, লালন সাঁই শুধু একজন বাউল সাধক ছিলেন না, তার গান ও জীবনদর্শন ছিল মানবমুক্তি, সাম্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য প্রকাশ। জাত-পাত, ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়নের শিক্ষা দিয়েছেন তিনি। তার দর্শন আজও সমাজে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় প্রাসঙ্গিক।

আলোচনা সভা শেষে লালন সাঁইয়ের গান ও তার জীবনদর্শনভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। গানের সুর ও বাণীর মধ্য দিয়ে শিল্পীরা তুলে ধরেন মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং জাত-পাতের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়ের কথা।

সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছিল জেলা শিল্পকলা একাডেমি, কুমিল্লা।