শিক্ষক সংকটে প্রাথমিক শিক্ষা

রাঙ্গামাটির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো চরম শিক্ষক সংকটে। জেলার ৭০৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪৩৮টি বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক। অবসর, মৃত্যু ও বদলিজনিত শূন্যপদ পূরণ না হওয়ায় বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু প্রধান শিক্ষক নয়, সহকারী শিক্ষকের পদও খালি ৭৫৯টি। অর্থাৎ প্রধান ও সহকারী শিক্ষক মিলিয়ে অনুমোদিত পদের বিপরীতে মোট ১ হাজার ১৯৭টি পদ খালি। এর বাইরে প্রশিক্ষণ ও ছুটির কারণে কাগজে কর্মরত দেখানো অনেক শিক্ষকও বছরের বিভিন্ন সময়ে শ্রেণিকক্ষে থাকছেন না। ফলে কাগজের পরিসংখ্যানের চেয়ে বাস্তবে শিক্ষক সংকট আরও বেশি। সবশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১২৪ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পর গত সাড়ে ছয় বছরে হয়নি আর কোনো নিয়োগ পরীক্ষা।

রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানায়, জেলায় প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৭০৭টি। এর মধ্যে আগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৩৯৩টি, জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় ২০৬টি, ১৫০০ প্রকল্পের আওতায় ২৭টি, ইউএনডিপি পরিচালিত জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয় ৮১টি এবং জেলা পরিষদ কর্তৃক অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারি বিদ্যালয় ৬৩টি। এসব বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকসহ অনুমোদিত সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩ হাজার ৩৩২টি। এর বিপরীতে কর্মরত ২ হাজার ৫৭৩ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৭৫৯টি পদ। তবে চলতি দায়িত্বের মাধ্যমে কিছু পদ পূরণ থাকায় নতুন করে নিয়োগযোগ্য পদের সংখ্যা ৬১৫টি বলে জানিয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। উপজেলাগুলোর মধ্যে বাঘাইছড়িতে প্রধান শিক্ষক সংকট সবচেয়ে প্রকট। উপজেলার ১১৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৭৮টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। লংগদুর ৭৪টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিতে প্রধান শিক্ষকের পদশূন্য। এ ছাড়া সহকারী শিক্ষকের ক্ষেত্রে বেশি পদ শূন্য রয়েছে বাঘাইছড়িতে ১৬৩টি। লংগদুতে শূন্য রয়েছে ১১২টি পদ, বরকলে ৭৫, রাজস্থলীতে ৭৪, জুরাছড়িতে ৭৩, বিলাইছড়িতে ৬৫, নানিয়ারচরে ৬৩, কাউখালীতে ৪৯, সদরে ৪৯ এবং কাপ্তাইয়ে ৩৪টি পদ।

তিন দফা উদ্যোগ, শেষ হয়নি একটি পরীক্ষাও : শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ বারবার নেওয়া হলেও পরীক্ষা পর্যন্ত গড়াতে পারেনি প্রক্রিয়া। ২০২২ সালের মে মাসে শূন্যপদ পূরণের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। একই বছরের ২৩ অক্টোবর পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ৪০ বছর বয়সসীমা নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৪ মে আবার পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের বয়স নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা থাকায় সেটিও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ জেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত থাকার বিষয়টি সামনে রেখে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বয়সসীমা ৪০ থেকে ৩২ বছর নির্ধারণ করে ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পরীক্ষার তারিখ দেওয়া হয় ১৪ অক্টোবর। কিন্তু এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় কোটাব্যবস্থা। নিয়োগে একটি পক্ষ সারা দেশের মতো ৯৩ শতাংশ মেধা ও ৭ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগের দাবি জানায়। অন্য পক্ষ জেলা পরিষদের আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি তোলে। এ নিয়ে আন্দোলন শুরু হলে ১৪ অক্টোবরের পরীক্ষাও স্থগিত হয়ে যায়। পরে ২১ নভেম্বর পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হলেও কোটাব্যবস্থা নিয়ে বিরোধের জেরে শহরে হরতাল পালিত হয়। শেষ পর্যন্ত সেই পরীক্ষাও স্থগিত করে জেলা পরিষদ। এখন নিয়োগের কোটাব্যবস্থা নিয়ে ফাইল আইন মন্ত্রণালয়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নজির আহম্মদ তালুকদার বলেন, একটা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকলে প্রশাসনিক কাজে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়, আর সহকারী শিক্ষক না থাকলে পাঠদানে বেগ পেতে হয়। আমরা এই বিষয়ে ডিপিইও (জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার) স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি, তিনি এই বিষয়ে অবগত আছেন। তিনি আশ^স্ত করেছেন, দ্রুত এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের রাঙ্গামাটি জেলার সভাপতি অ্যাডভোকেট দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরের ভিত হচ্ছে প্রাইমারি স্কুল। কিন্তু পার্বত্য এই জেলায় প্রাইমারি শিক্ষাব্যবস্থা চলছে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে। দীর্ঘ বছর ধরে যদি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কিংবা সহকারী শিক্ষক পর্যাপ্ত না থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে গিয়ে কী শিখবে? তিনি সরকারকে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

এই বিষয়ে রাঙ্গামাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কফিল উদ্দিন বলেন, শিক্ষক নিয়োগের জন্য আমরা একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়ার পরও নানান কারণে সেগুলো আর হয়নি। শিক্ষক স্বল্পতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই আমরা শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করব। পার্বত্য চুক্তি অনুসারী প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগ পার্বত্য জেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান দীপন তালুকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিষদ মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগের যে ছাড়পত্র এনেছিল, নির্ধারিত সময়ে নিয়োগ দিতে না পারায় মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেটির। তাই নতুন করে মন্ত্রণালয়ের কাছে চাওয়া হয়েছে ছাড়পত্র। অনুমোদন পেলেই দ্রুত নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষক সংকটের সমাধান করা হবে।