রাজধানীর পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা উত্তরা, যাকে বলা হয় ‘মডেল টাউন’। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখানে আবাসিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিংমলসহ নানা নাগরিক সুবিধা গড়ে উঠলেও মঞ্চনাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিল্পচর্চা ও পাঠচর্চাসহ সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি; নেই কোনো সিনেমা হলও। সাংস্কৃতিককেন্দ্র তৈরির সরকারি উদ্যোগের কথা বিভিন্ন সময়ে শোনা গেলেও বাস্তবে তা দৃশ্যমান হয়নি। সংস্কৃতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাংস্কৃতিক পরিসর ছাড়া মডেল টাউন উত্তরা আসলে কতটা আধুনিক? জনবহুল উত্তরায় সাংস্কৃতিক পরিসর কোথায়?
সাংস্কৃতিককেন্দ্র বা পরিসর মূলত সেই জায়গা, যেখানে মানুষ সৃজনশীল নানা তৎপরতার প্রকাশ ঘটায়। রাজধানী ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে আক্ষেপ করে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ‘আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিনোদনের জায়গাগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। এখন খাবারই যেন নগরবাসীর প্রধান বিনোদন। চারদিকে শুধু রেস্তোরাঁ আর খাবারের দোকান। নেই সিনেমা হল, সাংস্কৃতিককেন্দ্র, পাঠাগার।’
১৯৯১ সালে ঢাকায় ছিল ৬৪ লাখ মানুষের বসবাস। ঢাকা সিটি করপোরেশন ২০১১ সালে বিভক্ত হওয়ার পর মোট আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৩০৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, ঢাকার জনসংখ্যা তার চেয়েও অনেক বেশি। এই জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বসবাস করেন উত্তরায়। অথচ উত্তরায় কোনো সাংস্কৃতিক পরিসর না থাকাটা প্রশ্নবিদ্ধ করে এই মডেল টাউনকে।
বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত নাট্যকার ও অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী উত্তরার বাসিন্দা। তার মতে, জনবহুল এ এলাকায় প্রয়োজনীয় সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরায় মানুষের সংখ্যা অনেক হলেও এখানে নাট্যমঞ্চ বা গণপাঠাগারের ব্যবস্থা নেই। কয়েক বছর আগে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। তবে এ এলাকার বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়।’
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী নাজনীন হাসান চুমকিও থাকেন উত্তরায়। সেখান থেকে নিয়মিত থিয়েটারচর্চায় যুক্ত আছেন। তাকে সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমিতে এসে মহড়া এবং নাটকের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে হয়। নাজনীন চুমকি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উত্তরায় নাট্যমঞ্চ বা সাংস্কৃতিককেন্দ্র থাকা অত্যন্ত জরুরি। শিল্পকলা বা মহিলা সমিতিতে গিয়ে নাটক করা উত্তরাবাসীর জন্য কষ্টকর। স্থানীয় পর্যায়ে মঞ্চ থাকলে সাধারণ মানুষ নাটক দেখতে পারত।’
স্থানীয় পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ শিশু-কিশোর ও তরুণদের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন চুমকি। তার মতে, নাটক সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। সংস্কৃতিচর্চার সুযোগ তৈরি হলে শিশু-কিশোর ও যুবসমাজ সংস্কৃতিমনস্ক হয়ে গড়ে উঠতে পারে।
আলোক পরিকল্পক অম্লান বিশ্বাসও থাকেন উত্তরায়। তিনি জানান, উত্তরায় এখন শপিংমল থেকে শুরু করে সব কিছু আছে। কিন্তু কালচারাল প্রোগ্রাম করার জন্য কিছু নেই। এত লোক ও সাজানো-গোছানো মডেল টাউন হওয়া সত্ত্বেও কালচারালি একটা ভালো অডিটরিয়াম নেই। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।’ তবে উত্তরার কাছাকাছি বিমানবন্দর এলাকায় সেন্টার পয়েন্ট নামে একটি অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিসর ও শপিংমল হয়েছে উল্লেখ করে অম্লান বিশ্বাস বলেন, এখানে সিনেপ্লেক্স, আর্ট গ্যালারি হয়েছে। তবে সেটি গণমানুষের সাংস্কৃতিক পরিসরের চাহিদা মেটায় না। সরকারিভাবে উত্তরায় সাংস্কৃতিককেন্দ্র জরুরি।
নগরের বাসিন্দাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের পর্যাপ্ত পরিসর না রেখে কোনো নগরী আধুনিক হতে পারে না বলে মনে করেন স্থপতি ও চলচ্চিত্র পরিচালক এনামুল করিম নির্ঝর। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি পরিকল্পিত আবাসিক এলাকায় মানুষের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সাংস্কৃতিককেন্দ্রও থাকা উচিত। সাংস্কৃতিককেন্দ্র শুধু গান, নাটক বা বিনোদনের জায়গা নয়; শিল্পচর্চা, থিয়েটার, চিত্রপ্রদর্শনীসহ নানা সৃজনশীল কর্মকান্ডের ক্ষেত্র হতে পারে। উত্তরার মতো বড় এলাকায়, বিশেষ করে বিমানবন্দরের কাছে, একটি সাংস্কৃতিককেন্দ্র, আর্ট গ্যালারি বা থিয়েটার থাকলে এলাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ হতো। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে এখনো যথেষ্ট পরিকল্পনা নেই।’
উত্তরায় একটি মুক্তমঞ্চ থাকলেও নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের জন্য সেটি যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাদের মতে, একটি জনবহুল পরিকল্পিত এলাকায় সাংস্কৃতিককেন্দ্র, মিলনায়তন, পাঠাগার ও শিল্পচর্চার সুযোগ থাকা নাগরিক অবকাঠামোরই অংশ। উত্তরায় নাটক, সংগীত, শিল্পচর্চা, প্রদর্শনী ও পাঠচর্চার জন্য পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরির বিষয়টি এখনো অপেক্ষায় রয়েছে।