সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে কালীগঞ্জ থানার কৃষ্ণনগর এলাকায় পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, শনিবার রাত ১১টার দিকে যৌথ অভিযানে শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে এ মামলায় আরও দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত সোমবার শামীম (৩৮) ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে-এমন অভিযোগে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে তাকে প্রথম মারধর করা হয়।
পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নেওয়ার সময় একদল লোক শামীমকে সেখান থেকে বের করে আবার মারধর করে। পরে পুলিশ তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর রাতে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে একটি মিছিল নিয়ে হাসপাতালে হামলা চালানো হয়। সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবারও মারধর করা হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ফজলুল হক আমিনীকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, বারবার মব সৃষ্টি ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরও শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় ফজলুল হক আমিনী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেবহাটার পারুলিয়া এলাকায় তার তৎপরতা বেড়েছে বলেও দাবি তাদের। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় মব বা বিচারবহির্ভূত নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ উঠলেও আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তারা।
ফজলুল হক আমিনী দাবি করেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে পারুলিয়ার এক যুবক আল্লাহ, রাসুল ও কোরআন-হাদিস নিয়ে কটূক্তি করেছেন। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তিনি নিজের অবস্থান থেকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। আগের ঘটনাগুলোতেও উপস্থিত থাকা ও নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। ফেসবুকে পোস্ট ও লাইভের মাধ্যমে লোক জড়ো করে বিচারবহির্ভূত মব সৃষ্টির কথাও তিনি স্বীকার করেন। প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করলে তার আপত্তি নেই উল্লেখ করে আমিনী বলেন, এর পরিণতিতে তার ফাঁসি বা কারাদণ্ড হলেও তার কোনো আফসোস নেই।
শামীম হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হওয়ার পর থেকে আমিনীকে এলাকায় দেখা যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে তার পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে দ্রুত আমিনীকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছিল নিহত শামীমের পরিবার।
এ ঘটনায় মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না। ফজলুল হক আমিনী যে দুঃসাহস ও ঔদ্ধত্য দেখিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এখনই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র এখনই জোরালো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে এ ধরনের মব সন্ত্রাস বারবার ঘটতে থাকবে। তার ভাষ্য, এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে আমিনী আইনকে তোয়াক্কা করেন না। তিনি যে ভাষাতেই নিজের কর্মকাণ্ডের সাফাই দিন না কেন, প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড বা বিচারবহির্ভূত শাস্তির কথা বলেছেন। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত তাকে কোনোভাবেই ছাড় না দেওয়া।